স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৭৫৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭২ জন, খুলনা বিভাগে ২৬৪ জন, বরিশাল বিভাগে ২২৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৮৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৯ জন, রংপুর বিভাগে ৭৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ১১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৫ জনে এবং মোট মৃত্যু হয়েছে ৪১৫ জনের। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন এবং বর্তমানে ৬ হাজার ২৫১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের বড় অংশ পুরুষ হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীদের হার বেশি। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৬২ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী হলেও মৃতদের মধ্যে ১৯২ জন নারী ও ১৭১ জন পুরুষ (প্রায় ৫২ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অসুস্থতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের তুলনায় নিজের স্বাস্থ্যের অবহেলা করা, চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া এবং আর্থিক ও সামাজিক বিভিন্ন বাধা তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় শারীরিক পরিবর্তন, সঠিক সময়ে সতর্ক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ না করা এবং পুষ্টির ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমাতে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের জন্য সময়মতো চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসাবিদেরা।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণসমূহ:
তীব্র জ্বর: রোগীর শরীরে হঠাৎ করেই ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চমাত্রার জ্বর আসতে পারে।
তীব্র ব্যথা: মাথার প্রচণ্ড ব্যথার পাশাপাশি চোখের পেছনের অংশে এবং শরীরের বিভিন্ন পেশি ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথার তীব্রতার জন্যই ডেঙ্গুকে অনেক সময় ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ বা ‘breakbone fever’ বলা হয়ে থাকে।
ত্বকে ফুসকুড়ি: সাধারণত জ্বর আসার দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে রোগীর সারা শরীরে লালচে রঙের র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
অন্যান্য উপসর্গ: অতিরিক্ত ক্লান্তি, খাবারের প্রতি অরুচি, বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া।
মারাত্মক ডেঙ্গুর বিপজ্জনক লক্ষণ:
সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার ৩ থেকে ৭ দিনের মাথায় ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম নামে পরিচিত। রোগীর মধ্যে এই বিপজ্জনক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলেই বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে:
পেটে তীব্র ব্যথা হওয়া কিংবা অনবরত বমি হওয়া।
নাক, মাড়ি বা ত্বক থেকে রক্তপাত হওয়া অথবা বমি ও মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া কিংবা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
রক্তে প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা দ্রুত কমে যাওয়া।
রোগীর অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চরম ছটফটানি ভাব দেখা দেওয়া।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে করণীয় ও প্রাথমিক সতর্কতা:
ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকলেও সঠিক পরিচর্যা ও সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: রোগীকে সম্পূর্ণ শারীরিক বিশ্রামে রাখতে হবে।
তরল খাবার গ্রহণ: শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে খাবার স্যালাইন (ORS), ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও স্যুপের মতো প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
ওষুধের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা: জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। ভুলেও অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক (NSAID) ওষুধ সেবন করা যাবে না, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি মারাত্মক বাড়িয়ে দেয়।
নিয়মিত পরীক্ষা: চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে নিয়মিত রক্তের সিবিসি (CBC) এবং প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা করাতে হবে।
পড়ুন : ২৪ ঘন্টায় হাম উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু
সা/


