তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য অর্জনে বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি ডলার। বিদ্যমান সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে এ বাণিজ্য আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় তুরস্কের ১০৩তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ঢাকার একটি হোটেলে তুরস্কের দূতাবাস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, কূটনীতিক ও অতিথিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ককে ঐতিহাসিক সংহতি এবং ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং ব্যবসায়িক পর্যায়ে অংশীদারিত্ব জোরদারের মাধ্যমে আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলার ও এর বেশি পর্যায়ে উন্নীত করতে প্রস্তুত।’
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে দুই দেশের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং জনগণের সামগ্রিক সমৃদ্ধি অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সহযোগিতা এখন আর শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বৈঠকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমুখী করার অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের মানবিক সহায়তা ও অব্যাহত সংহতির জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় তুরস্কের সমর্থনের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কামাল পাশা’ কবিতার উল্লেখ করেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, কবিতাটি তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের শ্রদ্ধা ও অনুরাগের প্রতীক। এ সময় বাংলাদেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় তুরস্কের অব্যাহত সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন বলেন, বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ অনুসন্ধানে তুরস্ক তার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে তুরস্কের বিভিন্ন কোম্পানির উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ঢাকা ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে সরাসরি যাত্রী ও পণ্যবাহী বিমান চলাচল দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উচ্চপর্যায়ের সফর ও নিয়মিত যোগাযোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ-৩১ সম্মেলনের বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ৫ ও ৬ জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফর এবং আন্তর্জাতিক বিচার সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নিতে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক তুরস্ক সফরের বিষয়টিও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৭ ঢাকায় যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান রাষ্ট্রদূত রামিস সেন। বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের সামগ্রিক অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা গাজী মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্কের প্রজাতন্ত্র ঘোষণার স্মরণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের কার্যক্রম দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি করবে।
পড়ুন:স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কমল ৫,৪৮২ টাকা
ইমি/


