জন্মস্থান বাগেরহাটের হয়ে খেলতে পারেনি ব্যডমিন্টন শিরোপা জয়ী লিকা, খেলতে হলো নারায়ণগঞ্জের জার্সি পরে। নিজের জন্মমাটি বাগেরহাটের হয়ে কোর্টে নামার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু ঘরের মেয়েকে চিনতেই পারল না বাগেরহাট জেলা ক্রীড়া সংস্থা। নিজ জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে ডাকাই হয়নি তাকে। চরম অবহেলা, গাফিলতি আর উদাসীনতার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য জেলার জার্সি গায়ে জড়াতে বাধ্য হলেন বাগেরহাটের কৃতী সন্তান লিকা পোদ্দার। আর তাতেই ঘটল এক চরম ট্র্যাজেডি— নারায়ণগঞ্জ জেলার হয়ে খেলে জাতীয় ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশসেরার মুকুট মাথায় পরেছেন লিকা। লিকার এই মহাকাব্যিক জয়ে যখন পুরো দেশ মেতেছে, তখন বাগেরহাটের ক্রীড়ামোদীদের মনে বইছে ক্ষোভ আর অপমানের ঝড়। প্রশ্ন উঠেছে, জেলার শীর্ষ ক্রীড়া কর্তাদের এই চরম ব্যর্থতার দায় কে নেবে!
জাতীয় ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতার মতো এত বড় একটি আসর চলে গেল, অথচ বাগেরহাটের নিজস্ব খেলোয়াড় লিকা পোদ্দারকে জেলা থেকে ডাকারই কোনো প্রয়োজন মনে করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঘরের মাঠে অবহেলিত লিকা বাধ্য হয়ে যখন নারায়ণগঞ্জের জার্সি গায়ে জড়ালেন, তখনই প্রমাণ করলেন নিজের জাত। একের পর এক প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করে ছিনিয়ে নিলেন জাতীয় শিরোপা। লিকার এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য একদিকে যেমন বাগেরহাটের জন্য গর্বের, অন্যদিকে জেলার ক্রীড়া নীতি নির্ধারকদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত।
লিকা পোদ্দারের এই অবহেলার পেছনে কার হাত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক চরম সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চিত্র। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা সরাসরি হাত ধুয়ে ফেলেলেন। তার সাফ কথা— কোনো খেলোয়াড় কোন খেলায় অংশগ্রহণ করবে বা খেলোয়াড়দের পৃষ্ঠপোষকতা করার দায়িত্ব তার নয়; এই সমস্ত দায়ভার জেলা ক্রীড়া সংস্থার।
সবচেয়ে লজ্জাজনক এবং বিস্ময়কর বিষয় হলো, বাগেরহাট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি খোদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলাম মোঃ বাতেন। অথচ জেলার সর্বোচ্চ এই কর্মকর্তা জাতীয় পর্যায়ের এই ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও জানতেন না! এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি, বরং পরে খোঁজখবর নিয়ে কথা বলবেন বলে দায়সারা মন্তব্য করেন। পদাধীকার বলে যিনি নিজেই জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি এবং জেলার অভিভাবক, সেই ডিসি গোলাম মোঃ বাতেনের এমন উদাসীন ভূমিকা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় ক্রীড়াবিদ, ও সাধারণ বাগেরহাটবাসী। ক্ষুব্ধ জেলাবাসীর প্রশ্ন— যিনি জাতীয় পর্যায়ের খেলাধুলার খবর রাখেন না এবং জেলার সেরা খেলোয়াড়দের খোঁজ নেন না, তিনি কীভাবে একটি জেলার ক্রীড়াঙ্গনের শীর্ষ পদে আসীন থাকেন! এই প্রশাসনিক নিস্পৃহীতা আজ বাগেরহাটের ক্রীড়াঙ্গনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় লিকা পোদ্দার বলেন, “আমার কাছে সবসময় আগে আমার জন্মস্থান বাগেরহাট। নিজ এলাকার হয়ে খেলার জন্য আমাকে যদি একবারের জন্যও ডাকা হতো, আমি অবশ্যই বাগেরহাটের হয়েই খেলতাম।”
একই সাথে দেশের জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ভেতরের কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচন করে লিকা আক্ষেপের সুরে বলেন, “গ্রাম অঞ্চলের অনেক খেলোয়াড় অত্যন্ত অসহায়। জেলা থেকে তাদের কোনো খোঁজখবরই নেয়া হয় না। জেলা বা জাতীয় পর্যায়ে কোনো খেলায় অংশ নিলে জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে ন্যূনতম কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। পরিস্থিতি এতটাই করুণ যে, অনেক সময় প্রতিযোগিতার প্রাইজ মানির টাকা দিয়ে বাসের ভাড়া মিটিয়ে আমাদের বাড়ি ফিরতে হয়।”
লিকা পোদ্দারের এই চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাগেরহাটের ক্রীড়া প্রশাসনের গাফিলতিকে সমাজের সামনে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে দিয়েছে। ক্রীড়াপ্রেমিরা বলছেন, সভাপতি তথা জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেনের এই চরম উদাসীনতা বন্ধ না হলে জেলা থেকে আর কোনো লিকা পোদ্দার উঠে আসবে না, বরং যা আছেন তারাও হারিয়ে যাবে।
পড়ুন:টাঙ্গাইলে নদী থেকে আওয়ামী লীগ নেতার লাশ উদ্ধার
ইমি/


