শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার ছক, নেপথ্যে আওয়ামী লীগ

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনের সহিংসতা, ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনায় কঠোর অবস্থানে গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শ্রমিক আন্দোলনের নামে নাশকতায় জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে অন্তত ২৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

অভিযানকারী ডিবি টিমের সদস্যদের ভাষ্য, নাশকতায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রাজনৈতিক দলের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, তাদের পেছনে মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার স্বজন। মিরপুরের পলাতক সাবেক সংসদ-সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা নাশকতার পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাজীপুরে এক যুবক পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাকে দেখে সাধারণ শ্রমিক বলে মনে হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সাজবুল ইসলাম নামের ওই যুবকের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে তার পরিচয় জানা যায়। তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং সংগঠনটির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা সাজবুলের মতো আরও অনেকে শ্রমিক আন্দোলন উসকে দিচ্ছেন বলে মনে করেন ডিএমপির যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার মো. মহিদুল ইসলাম।

নাশকতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হিসেবে যাদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন—কামাল গাজী, ওলিউল্লাহ অনিক, আলিফ হোসেন ইমন, নাহিদ হাসান, আরিফ আকন্দ, জায়েদ করিম রিয়াজ, রমজান সরকার, মোয়াজ্জেম শাহরিয়া (নিয়াজ), জুবায়েদ ইসলাম জিসান এবং মাহিম মোল্লা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের একটি অংশ ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে দেশে বিভিন্ন কৌশলে অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা করছে। সুযোগ বুঝে কোথায় কীভাবে নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, সে অপেক্ষায় রয়েছে তারা। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে ঢুকে সহিংসতা চালানো হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি।

এতে রাজধানী ঢাকাসহ মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সড়কগুলো হয়ে উঠেছে সংঘাতের কেন্দ্র। কয়েক দিন ধরে মিরপুরের ১০ নম্বর গোলচত্বর, ১১ নম্বর, কালশী ও আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়কে চলছে বিক্ষোভ ও অবরোধ। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ভাঙচুর করা হয়েছে শপিং কমপ্লেক্স ও কারখানা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পোশাক শ্রমিকদের বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের বাস্তবতা রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বল্প বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের এই অসন্তোষকে পুঁজি করেই একটি পক্ষ আন্দোলনকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকার বাইরে থেকে লোক এনে মিরপুরের বিভিন্ন মেস ও আশপাশের এলাকায় রাখা হয়েছিল। তারাই শ্রমিকদের আড়ালে থেকে বাসে হামলা এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে সরকার ইতোমধ্যে শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বারবার শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ৭ তারিখের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের কথাও বলা হয়েছে। এরপরও সহিংসতা অব্যাহত থাকার পেছনে রাজনৈতিক শক্তির মদদ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গোয়েন্দা সূত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শ্রমিকদের সরলতাকে পুঁজি করে একটি মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু তৃণমূল নেতাকর্মী এই সুযোগ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা সাধারণ শ্রমিকদের ভিড়ে মিশে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় জড়াচ্ছেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে থেকে কিছু লোক এনে মিরপুর ও আশুলিয়া এলাকায় জড়ো করা হয়েছে। তাদের মূল কাজ ছিল শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া এবং আন্দোলনকে সহিংস করে তোলা।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই শিল্পকে ঘিরে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিনের। যখনই দেশ স্থিতিশীলতার দিকে এগোয়, তখনই একটি চক্র পোশাক খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করে। বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে ভীতি ছড়ানোও তাদের উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, পোশাক শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির প্রাণ। তাদের শ্রমের বিনিময়েই দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসে। তাই তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া মালিক ও সরকারের দায়িত্ব। তবে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের নামে কেউ দেশ ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে তা প্রতিরোধ করা জরুরি।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার আন্তরিক। ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কিন্তু একটি মহল শ্রমিকদের কাঁধে ভর করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। এর পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। সাধারণ শ্রমিকরা ভাঙচুর করেন না। বাইরে থেকে লোক এনে নাশকতা চালানো হচ্ছে। নাশকতাকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি পুলিশের সহানুভূতি রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটছে। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী ও রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া মহল সাধারণ শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, রাজধানীর বাইরে থেকে ভাড়া করে কিছু উসকানিদাতাকে মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এনে রাখা হয়েছিল। তারাই সাধারণ শ্রমিকদের আড়ালে থেকে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর চালিয়েছে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।

ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নাশকতার সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের রাজনৈতিক পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া গেছে। সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী ও দুষ্কৃতকারীরা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে অরাজকতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শ্রমিকদের কাঁধে ভর করে যারা ঢাকাকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির প্রতিটি সদস্য কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো ধরনের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না। পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।

ডিবি মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, রাজধানীতে ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নাম ও ব্যানারে লোক জড়ো করে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। ঢাকার বাইরে থেকে নিষিদ্ধ দলের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী এনেছেন আলিফ মোল্লা ও সুজন নামের এক ব্যক্তি।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, ন্যূনতম বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন করছিলেন। পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে এবং গাড়িতে আগুন দিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। নাশকতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের এসপি মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, রাজনৈতিক ইন্ধনেই গাজীপুরে পোশাক কারখানায় অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিষিদ্ধ সংগঠনের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নাশকতায় জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেফতার করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (আশুলিয়া) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, আশুলিয়া এলাকায় কিছু কারখানার শ্রমিক কাজে যোগ না দিয়ে বিশৃঙ্খলা করছেন। শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পালটাধাওয়ার সময় ককটেল সদৃশ বস্তুও উদ্ধার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র: যুগান্তর

পড়ুন: দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় লাফ

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন