৫ আগস্টের পরও আ.লীগ নেতার দাপট, লাকসামে ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন নিয়ে ক্ষোভ

কুমিল্লার লাকসামে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ভোটকেন্দ্র পরিবর্তনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার লাকসাম পূর্ব ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে দক্ষিণ নরপাটি জামেয়া ইসলামিয়া জুলকারনাইন মাদ্রাসার পরিবর্তে নরপাটি আইডিয়াল বিদ্যালয়কে ভোটকেন্দ্র হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নরপাটি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত মাস্টার মাহবুবুল আলম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব বজায় রয়েছে। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে পুরোনো ভোটকেন্দ্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

একই ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচিত আবদুল মান্নান খোকন ও দুলাল মিয়ার ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসীর একটি অংশ। তাঁদের দাবি, এই তিন ব্যক্তির প্রভাবে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটকেন্দ্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জুলকারনাইন মাদ্রাসা নিজস্ব জমি ও স্থায়ী ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় তিন দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মাদ্রাসাটিতে পর্যাপ্ত জায়গা, নিরাপদ পরিবেশ এবং ভোটারদের যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে।

অন্যদিকে নতুন কেন্দ্র হিসেবে তালিকাভুক্ত নরপাটি আইডিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠানটি একটি ভাড়া ভবনে পরিচালিত বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন সুমন ওরফে ডাঃ সুমন। ভবনের মালিক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কর্তৃপক্ষ পৃথক হওয়ায় অস্থায়ী ব্যবস্থায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটিকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে ভবনমালিকের বক্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক

এদিকে গত ১ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তাদের এলাকায় আসার সময় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে নরপাটি আদর্শ বিদ্যালয়ের ভবনমালিক আবদুল্লাহ আল মামুন সুমন ওরফে ডাঃ সুমন অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে জুলকারনাইন মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছিল।

তবে তাঁর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ। তাঁদের দাবি, অতীতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টার সঙ্গে ভবনমালিক সুমন নিজেও জড়িত ছিলেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, লাকসাম পূর্ব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত জাকির পণ্ডিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় জুলকারনাইন মাদ্রাসা কেন্দ্রটি আওয়ামী লীগের পক্ষে দখলের চেষ্টা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন সুমন ওরফে ডাঃ সুমন।

এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, অতীতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠা একজন ব্যক্তি এখন সেই কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি তুলে নিজের মালিকানাধীন ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন কেন?

৩ হাজার ১২৪ ভোটারের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন

কুমিল্লা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত ভোটকেন্দ্রের তালিকা অনুযায়ী, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে মোট ভোটার ৩ হাজার ১২৪ জন। এর মধ্যে দক্ষিণ নরপাটিতে ২ হাজার ২০৩ জন, দাসপাড়ায় ৪৭৪ জন এবং পশ্চিম সাহেবপাড়ায় ৪৪৭ জন ভোটার রয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, পুরোনো মাদ্রাসা কেন্দ্রে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৭০০ থেকে ৩ হাজার ভোটারের ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। বিপরীতে নতুন বিদ্যালয়ের অবকাঠামো প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ভোটারের জন্য উপযোগী বলে তাঁদের মূল্যায়ন। যদিও প্রকাশিত সরকারি তালিকায় নতুন কেন্দ্রের আওতায় পুরো ৩ হাজার ১২৪ জন ভোটারকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন বিদ্যালয়ের কাছাকাছি প্রায় একশো গজের মধ্যে আরেকটি ভোটকেন্দ্র রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি দুটি কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি হলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যাতায়াত ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

নির্বাচন কমিশনে আবেদন ও মানববন্ধন

এ ঘটনায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদন করে জুলকারনাইন মাদ্রাসায় ভোটকেন্দ্র পুনর্বহালের দাবি জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

আবেদনে স্বাক্ষর করেন মো. সায়মন খান, জামাল হোসেন, জাকির হোসেন খান, আবুল হাশেম ও আতাউর রহমান খান। একই দাবিতে দক্ষিণ নরপাটি জামতলী এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি অতীতের ভোটকেন্দ্র দখলসংক্রান্ত পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থায়ী ভবনের পরিবর্তে ভাড়া ভবনে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের প্রশাসনিক কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ভোটারদের সুবিধা, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে জুলকারনাইন মাদ্রাসাকে আগের মতো ভোটকেন্দ্র হিসেবে পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : দাবি না মানলে সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে: জামায়াত আমির

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন