বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের হ্যাকিং: জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার উত্তর কোরিয়ার

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের সাইবার হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির দাবি, এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তর কোরিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে এমন অভিযোগ তুলছে। এ নিয়ে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কিম ইয়ো-জং যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বাইন্যান্সের হ্যাকিংয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি উসকানিমূলক পদক্ষেপ। তাঁর ভাষায়, এসব অভিযোগ ‘অসংলগ্ন ও ভিত্তিহীন’।

কিম ইয়ো-জংয়ের দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সাইবার অপরাধের জন্য বারবার উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যেও এ ধরনের অভিযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, বাইন্যান্সে সংঘটিত বড় ধরনের এই ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকারদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এফবিআই, যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস এবং ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের অনুসন্ধানে এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এফবিআইয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্স থেকে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ভার্চুয়াল সম্পদ চুরি হয়। সংস্থাটি এ হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ ট্রেডারট্রেটরকে দায়ী করেছে। এ গ্রুপটি লাজারাস গ্রুপ নামেও পরিচিত।

মার্কিন তদন্তকারীদের ধারণা, চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সির বড় একটি অংশ ইথেরিয়ামে রূপান্তর করা হয়েছে। পরে এসব সম্পদ বিভিন্ন বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবং তাৎক্ষণিক বিনিময় সেবার মাধ্যমে স্থানান্তর করে অর্থের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হতে পারে।

এফবিআই শুধু হামলার জন্য সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করেই থেমে থাকেনি। চুরি করা অর্থের লেনদেন বন্ধ করতে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে ব্লকচেইন নোড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় সেবা প্রদানকারী, বিকেন্দ্রীভূত আর্থিক সেবা এবং ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান।

এফবিআইয়ের উদ্দেশ্য হলো, চুরি করা সম্পদ যেসব ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবহার করে স্থানান্তর করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আটকে দেওয়া।

ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক বড় ধরনের চুরির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিটে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সাইবার হামলার ঘটনায় ট্রেডারট্রেটর বা লাজারাস গ্রুপকে দায়ী করা হয়েছিল।

ওই হামলার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া হয়, যা সে সময় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাইন্যান্সের ঘটনা সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মকে লক্ষ্যবস্তু করছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সীমিত থাকায় ডিজিটাল সম্পদ চুরির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।

এদিকে বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং গ্রাহকদের সম্পদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার পর প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা, সাইবার আক্রমণের প্রযুক্তিগত দিক এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কাজ করছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের বড় অংশ নিজস্ব অর্থায়নে পুনরায় পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্য ব্লকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইন্যান্স প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ পুনরায় পূরণ করেছে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া উত্তোলন কার্যক্রম চালু হওয়ার পর গ্রাহকেরা প্রায় ৪৬৪ কোটি ডলারের সম্পদ তুলে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এত বড় অঙ্কের সম্পদ চুরির ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক সম্পদ সংরক্ষণ, লেনদেনের নিরাপত্তা এবং এক্সচেঞ্জগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাইন্যান্সে হামলার ঘটনায় এফবিআই উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান প্রকাশ করেছেন। ১ নভেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তবে উত্তর কোরিয়াই হামলার জন্য দায়ী কি না, তা নিয়ে তদন্তের বিষয়টি তখনো বিবেচনায় ছিল।

অন্যদিকে পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ধরনের অভিযোগের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। দেশটির বক্তব্য, প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের সাইবার হামলা শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের নিরাপত্তা নিয়ে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি হামলার প্রকৃত নেপথ্য কারণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নিশ্চিত করাই এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

পড়ুন:ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, দফায় দফায় বিস্ফোরণ

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন