একদিকে বসতভিটা, অন্যদিকে কবরস্থান। মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত মাটি। সেই মাটিটুকুও ধীরে ধীরে গ্রাস করছে মেঘনা নদী। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের আফাজিয়া এলাকায় নদীভাঙন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জীবিত মানুষের ঘরবাড়ির পাশাপাশি মৃত স্বজনদের শেষ ঠিকানাও এখন হুমকির মুখে।
কবরস্থানের পাশের মাটি ইতোমধ্যে নদীতে ধসে পড়েছে। কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল, কোথাও কবরের পাশের মাটি হয়ে পড়েছে নরম। নদী আর একটু এগিয়ে এলেই মেঘনার স্রোতে বিলীন হয়ে যেতে পারে কবরগুলো। এ নিয়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরঈশ্বর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আফাজিয়া বাজার জামে মসজিদের সামনের কবরস্থানে কয়েক বছর আগে স্থানীয় মাস্টার, মিয়া ও ভূঁইয়াসহ বেশ কয়েকজনকে দাফন করা হয়। একসময় কবরস্থানটি নদী থেকে বেশ দূরে থাকলেও গত কয়েক বছরের অব্যাহত ভাঙনে নদীর তীর সরে এসে এখন কবরস্থানের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছে।
স্থানীয়দের দাবি, মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে ইতোমধ্যে এলাকার অসংখ্য ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার হারিয়েছে শেষ সম্বলটুকুও। এবার সেই ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে তাঁদের স্বজনদের কবরস্থান।
আফাজিয়া বাজার জামে মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি আজিজ মিয়া বলেন, “মানুষ মারা যাওয়ার পর কবরই তাঁর শেষ ঠিকানা। স্বজনকে দাফন করার পর মনে করি, অন্তত এই জায়গাটুকু থাকবে। কিন্তু নদী যদি সেই কবরও নিয়ে যায়, তাহলে কষ্টটা আরও বেশি। ঘর হারানোর কষ্ট সহ্য করা যায়, কিন্তু বাবা-মা কিংবা স্বজনের কবর নদীতে বিলীন হতে দেখা আরও বেদনাদায়ক।”
স্থানীয়রা জানান, জোয়ারের সময় নদীর পানি বাড়লে তাঁদের আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। নদীর তীর থেকে মাটি সরে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অনেকেই কবরস্থানে গিয়ে স্বজনদের কবর দেখে আসেন। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে একসময় কবরগুলোর অস্তিত্বও মুছে যেতে পারে।
স্থানীয় মানুষের কাছে কবরস্থান শুধু কয়েক হাত মাটি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবার, স্মৃতি ও প্রজন্মের সম্পর্ক। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করতে প্রতিনিয়ত সেখানে যান স্বজনরা। সেই শেষ আশ্রয়টিই যখন নদীর কিনারায় চলে আসে, তখন তাঁদের উদ্বেগ ও কষ্টের সীমা থাকে না।
হাতিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মেঘনার ভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ঘর সরিয়ে নতুন করে বসতি গড়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ঘরবাড়ি হারালে নতুন করে ঘর তৈরি করা যায়, কিন্তু নদীতে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কবর আর ফিরে পাওয়া যায় না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ কবরস্থানটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মেঘনার ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, জীবিত মানুষের ঘরবাড়ি ও জমিজমা মেঘনা কেড়ে নিচ্ছে, এবার কি নিরাপদ থাকবে না মৃত স্বজনদের শেষ ঠিকানাটুকুও?
মেঘনার ভাঙন তাই হাতিয়ার মানুষের কাছে এখন শুধু ঘরবাড়ি কিংবা জমি হারানোর গল্প নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, শিকড় ও পারিবারিক অস্তিত্ব হারানোর বেদনাও। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একদিন হয়তো বসতভিটার মতোই মেঘনার বুকে হারিয়ে যাবে বহু মানুষের প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা।
এ ব্যাপারে হাতিয়া উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী জামিল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, আফাজিয়া এলাকায় এবার জিওটিউবের মাধ্যমে নদীভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি নলচিরা ঘাট এলাকায় স্যান্ড-সিমেন্ট জিও ব্যাগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষামূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
পড়ুন : শ্রমিক আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকের লাভ কতটুকু?
সা/


