প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পনগরী খুলনায়। সড়ক বিভাজকে রঙের প্রলেপ, দেয়ালে দেয়ালে ইতিহাস-ঐতিহ্যের গ্রাফিতি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বর্ণিল তোরণে বদলে যাচ্ছে নগরীর চিরচেনা চিত্র। একই সঙ্গে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো খুলনা সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী।
সফরকালে বাগেরহাটের মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, হযরত খানজাহান আলী (র.)-এর মাজার জিয়ারত এবং খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নগরীর নতুন রেলস্টেশন, জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সড়কের দেয়ালে আঁকা হচ্ছে বর্ণিল গ্রাফিতি। এসব চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি। খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের দেয়ালে স্থান পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী এস এম সুলতান, বাংলাদেশের ক্রিকেটার এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির ঐতিহাসিক চিত্র। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান।
খুলনা সিটি করপোরেশন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে স্টেডিয়ামের ভেতরে-বাইরে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। সরানো হয়েছে রাজনৈতিক পোস্টার-ব্যানার, দোকান ও হকারদের দখল। নগরীর শিববাড়ী এলাকার রেলওয়ের দেয়ালেও জুলাইয়ের গ্রাফিতির পাশাপাশি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে খুলনার ঐতিহ্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগরীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত তোরণ, প্যানা, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজ উদ্যোগে এসব প্রচারসামগ্রী সরিয়ে নিতে নেতাকর্মী, বিভিন্ন সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যস্ত সড়কে গর্ত খুঁড়ে তোরণ নির্মাণ এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোয় প্রচারসামগ্রী স্থাপন প্রধানমন্ত্রীর অনুসৃত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ব্যানার, প্যানা ও ফেস্টুন দ্রুত অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক নগরী গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম আকর্ষণ ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫০৩টি উপজেলায় একযোগে এ কর্মসূচির সূচনা সম্প্রচার করা হবে। এবারের আয়োজনে অংশ নিতে সাড়ে ১৬ লাখ শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের ভেতরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থী বর্ণাঢ্য আয়োজনে অংশ নেবে।
খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোল্লা খাইরুল ইসলাম বলেন, ৫ নভেম্বর খুলনাবাসীর জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। খুলনা থেকেই প্রধানমন্ত্রী ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন। এ উপলক্ষে জেলা স্টেডিয়ামের ভেতরে ও বাইরে বর্ণিল সাজসজ্জা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে বাগেরহাটের মোংলা বন্দরে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তিনি। একই সঙ্গে মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা সম্প্রসারণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
পরে বেলা ১১টার দিকে সড়কপথে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (র.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। সেখান থেকে দুপুরে খুলনা সার্কিট হাউজে পৌঁছে কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন। বিকেল ৩টায় জেলা স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করার কথা রয়েছে তাঁর।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী প্রস্তুতি। যানবাহন অধিগ্রহণ, বিশ্রামাগার প্রস্তুত, হেলিপ্যাড নির্মাণ, জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জেনারেটর এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা পাস ইস্যু ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।
সফর ঘিরে নগরজুড়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিশেষ তদারকি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, এসআরবি এবং সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে খুলনায় এখন সাজসাজ রব। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও উৎসবমুখর আয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই সফরের মধ্য দিয়ে খুলনার দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনাগুলোও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে।
পড়ুন : ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের প্রাণহানি


