জিয়ার জন্মভিটার নীরব কান্না, ইতিহাস সংরক্ষণে কোথায় দায়িত্বশীলরা?

একটি বাড়ি কখনো কখনো কেবল বসবাসের জায়গা থাকে না। হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ, একটি জাতির স্মৃতির ঠিকানা। সেই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি দরজা-জানালা, পুরোনো দেয়াল কিংবা প্রবেশপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনো না কোনো সময়ের গল্প। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বগুড়ার পৈতৃক বাড়িটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাড়িতে প্রবেশের ছোট গেটটির দিকে তাকালেই যেন চোখে পড়ে দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলার একটি চিত্র। যে বাড়িকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এত স্মৃতি, যে বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের শেকড় এবং একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্ম ও শৈশবের গল্প, সেই বাড়ির প্রবেশপথই যদি দর্শনার্থীদের মনে হতাশা তৈরি করে, তাহলে বাড়িটির সামগ্রিক রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জিয়াউর রহমানের স্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের সন্তান তারেক রহমানও বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক পরিবারের একজন সদস্য দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্ব পালন করছেন, সেই পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক বাড়িটির স্থায়ী সংরক্ষণ কেন এখনো দৃশ্যমান ও পরিকল্পিত রূপ পেল না?

এ প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক পরিবারের প্রতি নয়, বরং দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জাতীয় স্মৃতিসম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ববোধের প্রতিও।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ী গ্রামে অবস্থিত বাড়িটি স্থানীয়ভাবে ‘জিয়া বাড়ি’ নামে পরিচিত। সময়ের হিসাবে বাড়িটির বয়স প্রায় ১৩০ বছর। বাড়িটির দেয়ালে এখনো খোদাই করা রয়েছে নির্মাণের তারিখ—‘২২শে আষাঢ় ১৩০২ সন, ১৮৯৫ সাল’। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই বাড়ি শুধু একটি পরিবারের আবাসস্থল নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্থাপত্যিক সাক্ষী।

এই বাড়িতেই ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর বাবা মনসুর রহমান এবং মা জাহানারা খাতুন। পরিবারের আদরের নাম ছিল কমল। শৈশবের একটি সময় এই বাড়ি ও বাগবাড়ী গ্রামকে ঘিরেই কেটেছে তাঁর। পরে বাবার চাকরিসূত্রে পরিবারের সঙ্গে তাঁকে করাচিতে চলে যেতে হয়।

জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক। স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন তিনি।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে দেশে নানা মত ও বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই—তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর জন্মস্থান ও পারিবারিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে।

অথচ বাড়িটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা।

সম্প্রতি ঢাকা থেকে বগুড়ার বাগবাড়ীতে জিয়া বাড়ি দেখতে যান খিলক্ষেত নিকুঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা ও ওখানকার ‘নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তৌহিদুজ্জামান সরকার সৈকত।

নিজ পরিবার নিয়ে ঐতিহাসিক বাড়িটি সরাসরি দেখার আগ্রহে সেখানে গেলেও বাড়ির বর্তমান অবস্থা তাঁকে হতাশ করেছে।

তিনি বলেন, ‘এমন একজন মহান নেতার বাড়ির এমন জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে সত্যিই কষ্ট পেয়েছি। বাড়ির বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বাড়িটির প্রতি নজর দেওয়ার কেউ যেন নেই। মনে হচ্ছে, বাড়িটি যেন অভিভাবকহীন।’

তাঁর এই মন্তব্যে শুধু একজন দর্শনার্থীর ব্যক্তিগত কষ্টই প্রকাশ পায়নি, বরং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে আমাদের সামগ্রিক দায়িত্ববোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

একটি বাড়ির প্রবেশপথ দেখেই যদি দর্শনার্থীর মনে এমন ধারণা তৈরি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এর যথাযথ পরিচর্যা, সৌন্দর্যবর্ধন ও দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কতটা উদ্যোগী?

তবে বাড়িটির ইতিহাস ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও উঠে এসেছে। বাড়িটির দেখাশোনার দায়িত্বে দীর্ঘদিন ধরে একজন তত্ত্বাবধায়ক রয়েছেন। ১৯৭৬ সাল থেকে রফিকুল ইসলাম বাড়িটির দেখভাল করছেন বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে তাঁর বাবা এই দায়িত্ব পালন করতেন। বাড়িটির ছাদ ও কাঠের কিছু অংশ মেরামত এবং দেয়ালে রং করার কথাও জানা যায়।

অন্যদিকে, বাড়িটির মূল স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। বাড়ির ভেতরে এখনো জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত কিছু আসবাবপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর ব্যবহৃত কিছু সামগ্রী চট্টগ্রাম জাদুঘরে স্থানান্তরের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ বাড়িটির প্রতি একেবারেই কেউ নজর দেননি, বিষয়টি তেমন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ১৩০ বছরের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য যে ধরনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন, তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে?

এখানেই মূল উদ্বেগ।

বাড়িটি নিয়ে রাজনৈতিক আবেগ রয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও জিয়াউর রহমানের অনুসারীদের কাছে এটি বিশেষ আবেগের জায়গা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ বাড়িটি দেখতে আসেন। কিন্তু একটি জাতীয় ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিচর্যা কেবল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আবেগ কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
কারণ, ইতিহাস কোনো একটি দলের একক সম্পত্তি নয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর জীবনের একটি অংশ মাত্র। তাঁর জন্মস্থান, শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ এবং সময়ের সাক্ষ্য বহনকারী স্থাপনা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী দল বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। ২০০১ সালে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে বাড়িটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।

২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর পৈতৃক বাড়ি পরিদর্শন করেন। সে সময় তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে বাগবাড়ীর রাস্তাঘাট ও বাড়িটি নতুন করে সাজানোর খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

কিন্তু কোনো রাষ্ট্রনায়ক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাড়ি শুধু বিশেষ সফর কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সামনে রেখে সাজানো হলে তাকে স্থায়ী সংরক্ষণ বলা যায় না।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাড়িটি সাজানো সম্ভব হলে সারা বছর কেন সেটিকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে রাখা সম্ভব হবে না?

একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের পৈতৃক ভিটায় যান, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেখানে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সেই গুরুত্ব যেন কেবল সফরের দিনগুলোতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাড়িটির স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় ব্যক্তিত্বদের জন্মস্থান ও স্মৃতিবিজড়িত বাড়িগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়, তা থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু রয়েছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত ‘গান্ধী স্মৃতি’ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যে বাড়িতে মহাত্মা গান্ধী জীবনের শেষ ১৪৪ দিন কাটিয়েছিলেন, সেই বাড়িটি ১৯৭১ সালে ভারত সরকার অধিগ্রহণ করে জাতীয় স্মৃতিসৌধে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ আগস্ট এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

সেখানে শুধু বাড়ির কাঠামো সংরক্ষণ করা হয়নি; গান্ধীর ব্যবহৃত কক্ষ, প্রার্থনাস্থল, ব্যক্তিগত সামগ্রী, ছবি ও ঐতিহাসিক নিদর্শনও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাড়িটির স্থাপত্য ও আশপাশের পরিবেশও ঐতিহাসিক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রক্ষা করা হয়েছে।

ভারত সরকার মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি সংরক্ষণকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে। বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কিংবা দলীয় কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উদাহরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিয়াউর রহমানের বাগবাড়ীর বাড়িটিও একইভাবে একটি সুপরিকল্পিত স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করা যেতে পারে। সেখানে তাঁর জন্ম, শৈশব, পারিবারিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও আলোকচিত্র সংরক্ষণ করা সম্ভব।

এতে বাড়িটি শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের আবেগের জায়গা হয়ে থাকবে না; বরং দেশের ইতিহাস জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

এমনকি বাড়ির পাশের খালটিরও রয়েছে আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে এলাকার কৃষকদের সেচসুবিধার কথা বিবেচনা করে খালটি খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখনো স্থানীয় কৃষকেরা এই খাল থেকে সেচসুবিধা পান বলে জানা গেছে। ফলে বাড়িটি সংরক্ষণের পরিকল্পনায় শুধু মূল ভবন নয়, এর আশপাশের ঐতিহাসিক পরিবেশও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের আইনেও এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইনে শতবর্ষের বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। সরকার চাইলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কোনো স্থাপনাকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অন্যতম দায়িত্বও জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করা।

তাই বাগবাড়ীর জিয়া বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী হতে পারে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে সংরক্ষণের নামে বাড়িটির মূল স্থাপত্য পরিবর্তন করা যাবে না। ১৮৯৫ সালের নির্মাণশৈলী, পুরোনো দেয়াল, দরজা-জানালা এবং ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখেই সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ স্থপতি, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণবিদদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

বাড়িটির প্রবেশপথ সংস্কার, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড, দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা এবং ঐতিহাসিক তথ্য সংবলিত একটি প্রদর্শনীকক্ষ নির্মাণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাড়িটির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকা উচিত। সেখানে জিয়া পরিবারের প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ইতিহাসবিদ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এতে বাড়িটির পরিচর্যা কোনো একজন ব্যক্তির ইচ্ছা কিংবা সাময়িক উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, ইতিহাস সংরক্ষণ মানে কোনো ব্যক্তির সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানানো নয়। বরং ইতিহাসকে তার নিজস্ব বাস্তবতায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। যে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা থাকা উচিত নয়।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতে পারে। কেউ তাঁকে ভালোবাসেন, কেউ তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। কিন্তু তাঁর জন্মস্থান ও স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়।

একইভাবে বাংলাদেশের অন্যান্য জাতীয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাহিত্যিক, সংস্কারক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িগুলোকেও যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

আজ বাগবাড়ীর জিয়া বাড়ির প্রবেশপথ দেখে একজন দর্শনার্থীর মনে যদি অভিভাবকহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়, তাহলে সেটি কেবল একটি বাড়ির দৈন্যদশার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

যে বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন রাষ্ট্রপতির জন্মের ইতিহাস, যে বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, যে বাড়িতে দীর্ঘ বিরতির পর এসেছেন তাঁদের সন্তান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—সেই বাড়ির স্থায়ী পরিচর্যা নিশ্চিত করা কি খুব কঠিন?

রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা কিংবা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করার সঙ্গে শুধু ক্ষমতার দায়িত্ব জড়িত নয়; ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে।

বাগবাড়ীর এই বাড়িটি হয়তো আগামী কয়েক দশক পরও দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ না হলে এর দেয়াল, স্থাপত্য, স্মৃতিচিহ্ন ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য একসময় হারিয়ে যেতে পারে। তখন নতুন প্রজন্মের কাছে থাকবে শুধু একটি নাম, কিছু ছবি আর ইতিহাসের কয়েকটি পৃষ্ঠা।

আমরা চাই না, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন একদিন অবহেলার কারণে হারিয়ে যাক।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বাগবাড়ীর এই বাড়িটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশা রইল। একই সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

কারণ, ক্ষমতা একসময় শেষ হয়, রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, কিন্তু ইতিহাস থেকে যায়। আর ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মেরই।

বাগবাড়ীর ‘জিয়া বাড়ি’ যেন শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের পৈতৃক ভিটা হয়ে না থাকে; হয়ে উঠুক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সংরক্ষিত স্মৃতির ঠিকানা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে দায় সরকারকেই নিতে হবে: মঞ্জু

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন