দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৫ নভেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও সাতজন। একই সময়ের ব্যবধানে সারাদেশে নতুন করে ১ হাজার ৫৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারানো সাতজনের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন করে এবং খুলনা বিভাগে একজন রয়েছেন।
অন্যদিকে, নতুন ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৫৯৬ জন রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৮৮ জনই ঢাকা বিভাগের (ঢাকা মহানগরসহ)। এর বাইরে বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের তালিকায় রয়েছে— চট্টগ্রাম বিভাগ: ২৯৫ জন, খুলনা বিভাগ: ২২১ জন, বরিশাল বিভাগ: ২১৩ জ, রাজশাহী বিভাগ: ১৪৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগ: ৮৩ জন, রংপুর বিভাগ: ৬৭ জন, সিলেট বিভাগ: ১৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭১ জনে। এই সময়সীমার মধ্যে সর্বমোট ৪৫২ জনের মৃত্যু ঘটেছে। তবে ইতোমধ্যে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮০ জন।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোট ৫ হাজার ৮৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী। এদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে সর্বাধিক ২ হাজার ৫৯৮ জন ভর্তি আছেন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে খুলনা বিভাগে ৯৭৩ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৯১ জন, রাজশাহী বিভাগে ৬৫২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪০২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৩৭ জন, রংপুর বিভাগে ২২৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৬০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণসমূহ:
তীব্র জ্বর: রোগীর শরীরে হঠাৎ করেই ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চমাত্রার জ্বর আসতে পারে।
তীব্র ব্যথা: মাথার প্রচণ্ড ব্যথার পাশাপাশি চোখের পেছনের অংশে এবং শরীরের বিভিন্ন পেশি ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথার তীব্রতার জন্যই ডেঙ্গুকে অনেক সময় ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ বা ‘breakbone fever’ বলা হয়ে থাকে।
ত্বকে ফুসকুড়ি: সাধারণত জ্বর আসার দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে রোগীর সারা শরীরে লালচে রঙের র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
অন্যান্য উপসর্গ: অতিরিক্ত ক্লান্তি, খাবারের প্রতি অরুচি, বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া।
মারাত্মক ডেঙ্গুর বিপজ্জনক লক্ষণ:
সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার ৩ থেকে ৭ দিনের মাথায় ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম নামে পরিচিত। রোগীর মধ্যে এই বিপজ্জনক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলেই বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে:
পেটে তীব্র ব্যথা হওয়া কিংবা অনবরত বমি হওয়া।
নাক, মাড়ি বা ত্বক থেকে রক্তপাত হওয়া অথবা বমি ও মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া কিংবা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
রক্তে প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা দ্রুত কমে যাওয়া।
রোগীর অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চরম ছটফটানি ভাব দেখা দেওয়া।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে করণীয় ও প্রাথমিক সতর্কতা:
ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকলেও সঠিক পরিচর্যা ও সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: রোগীকে সম্পূর্ণ শারীরিক বিশ্রামে রাখতে হবে।
তরল খাবার গ্রহণ: শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে খাবার স্যালাইন (ORS), ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও স্যুপের মতো প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
ওষুধের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা: জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। ভুলেও অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক (NSAID) ওষুধ সেবন করা যাবে না, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি মারাত্মক বাড়িয়ে দেয়।
নিয়মিত পরীক্ষা: চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে নিয়মিত রক্তের সিবিসি (CBC) এবং প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা করাতে হবে।
পড়ুন : হাম উপসর্গে একদিনে ৩ শিশুর মৃত্যু
সা/


