ফুটবল মাঠে গোল, রেকর্ড আর শিরোপা জয়ের পাশাপাশি কোচদের সঙ্গে বিরোধেও একাধিকবার আলোচনায় এসেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে জর্জ জেসুস, জোসে মোরিনহো, রাফায়েল বেনিতেজ থেকে শুরু করে এরিক টেন হ্যাগ—একাধিক হাইপ্রোফাইল কোচের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। কখনো একাদশে জায়গা না পাওয়া, কখনো কোচের কৌশল নিয়ে অসন্তোষ, আবার কখনো প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি পর্তুগিজ কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নেশনস লিগের ম্যাচে তাঁকে প্রথম একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর জেরে ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের আগে জাতীয় দলের শিবির ছাড়েন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। যদিও এ ধরনের ঘটনা রোনালদোর ক্যারিয়ারে নতুন নয়। এর আগেও ক্লাব ও জাতীয় দলে দায়িত্ব পালন করা একাধিক কোচের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।
রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় স্বদেশি কোচ জোসে মোরিনহোর সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্কের অবনতি ছিল বেশ আলোচিত। দুই পর্তুগিজ তারকার মধ্যে একপর্যায়ে এমন দূরত্ব তৈরি হয় যে, মোরিনহো সরাসরি রোনালদোর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি তাঁকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সহকারীর সাহায্য নিতেন বলেও জানা যায়।
মোরিনহোর অধীনে রিয়াল মাদ্রিদে খেলেই রোনালদো অসাধারণ সাফল্য পেয়েছিলেন। তবে মাঠের পারফরম্যান্স ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ সব সময় এক ছিল না। দুজনের মধ্যে মতবিরোধ শেষ পর্যন্ত দলটির অন্দরমহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
২০১৫ সালে কার্লো আনচেলত্তির বিদায়ের পর রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেন রাফায়েল বেনিতেজ। কিন্তু নতুন কোচের খেলার কৌশল ও দল পরিচালনার ধরন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না রোনালদো। বেনিতেজের পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর অসন্তোষের বিষয়টি সে সময় প্রকাশ্যেই আলোচনায় আসে।
রোনালদো সব সময়ই নিজের পছন্দের আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং দলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন। ফলে কোচের কৌশল তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে না মিললে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
শুধু ক্লাব ফুটবল নয়, জাতীয় দলেও কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রোনালদোকে প্রথম একাদশে রাখেননি পর্তুগালের তৎকালীন কোচ ফার্নান্দো সান্তোস।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে বেঞ্চে রাখার সিদ্ধান্ত ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। কোচের এই সিদ্ধান্তে রোনালদোর স্ত্রী জর্জিনা রদ্রিগেজও অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি।
তবে কোচের সঙ্গে রোনালদোর সবচেয়ে আলোচিত বিরোধগুলোর একটি ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক কোচ এরিক টেন হ্যাগের সঙ্গে। ২০২১ সালে ইউনাইটেডে দ্বিতীয়বার যোগ দিয়ে প্রথম মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ১৮ গোল করেছিলেন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড। কিন্তু পরের মৌসুমে কোচের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।
টটেনহ্যাম হটস্পারের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানানোর পাশাপাশি খেলা শেষ হওয়ার আগেই টানেলে চলে যান রোনালদো। এ ঘটনায় তাঁকে ঘিরে ক্লাবের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মর্গানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের পর। সেখানে টেন হ্যাগের প্রতি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে রোনালদো স্পষ্ট জানান, ইউনাইটেড কোচের প্রতি তাঁর কোনো শ্রদ্ধা নেই। শুধু কোচ নন, ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ তোলেন তিনি।
সেই সাক্ষাৎকারের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতি ঘটে। এরপর সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে যোগ দেন এই তারকা।
জর্জ জেসুসকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা তাই রোনালদোর ক্যারিয়ারে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং কোচের সিদ্ধান্ত ও নিজের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তাঁর। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্বের সেরা কোচদের অধীনে খেলেছেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে সাফল্যও পেয়েছেন, আবার মতবিরোধেও জড়িয়েছেন।
রোনালদোর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মানসিকতার খেলোয়াড়ের কাছে মাঠে নিজের গুরুত্ব ধরে রাখা সব সময়ই বড় বিষয়। তবে কোচের সঙ্গে মতবিরোধ কতটা দলের পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে, সেটিও বারবার সামনে এসেছে। জর্জ জেসুসের সঙ্গে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
পড়ুন:সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে ২৬৮ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ
ইমি/


