গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় সাড়ে ৩১ কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী তীর রক্ষা প্রকল্পে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। প্রকৌশলী বা তদারকি কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ঢালাই কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবাধ লুটপাট ও উদাসীনতার মধ্য দিয়ে জনবহুল এই এলাকাকে আবারও নদীভাঙনের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
গত শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে উপজেলার কাতলামারী এলাকায় যমুনা নদীর ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের (কি.মি. ৭৫.৪০ হতে ৭৫.৯৪০ পর্যন্ত ৫০০ মিটার) স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজের সাইটে গিয়ে এই চিত্র হাতেনাতে ধরা পড়ে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিরক্ষা বাঁধের ঢালাই কাজ চলছে সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন অবস্থায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী বা ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্টের লেশমাত্র ছিল না সাইটে। সরকারি তদারকি ও নজরদারির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দায়সারাভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এর দীর্ঘ ৩০ মিনিট পর পাউবোর এক কর্মকর্তা সাইটে উপস্থিত হন, যা প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থার চরম ভঙ্গুর অবস্থাকেই স্পষ্ট করে।
সরেজমিনে কাজের মান যাচাই করতে গিয়ে একের পর এক গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মেলে।সিডিউলের নিয়ম ভেঙে ঢালাইয়ে ৪০ থেকে ৭০ মিলিমিটার পর্যন্ত বিশালাকার পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পাথর ছিল প্রচণ্ড ময়লাযুক্ত, যা কোনো ধরনের ধোয়া বা পরিচ্ছন্নতা ছাড়াই সরাসরি মিক্সচার মেশিনে দেওয়া হচ্ছিল।উন্নতমানের ‘সিলেকশন বালি’ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণ স্থানীয় (লোকাল) বালি। সিমেন্টের সঙ্গে পাথর ও বালির নির্ধারিত অনুপাত পাত্তাই দিচ্ছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের বিপরীতে যেখানে সুনির্দিষ্ট মাত্রা থাকার কথা, সেখানে অবাধে দেওয়া হচ্ছে ১২ ঝুড়ি পাথর ও ১০ ঝুড়ি লোকাল বালি! এতে স্থাপনার স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে।ঢালাইয়ের শক্তি ও স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি ‘এডমিকচার’ (রাসায়নিক মিশ্রণ) সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এমনকি ইতিপূর্বে করা ঢালাই অংশগুলোতে নিয়মিত কিউরিং (পানি ছিটানো) করা হচ্ছে না এবং সাইটে কিউরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চটের ব্যবস্থাও নেই।
প্রকল্পের সাইনবোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘যমুনা নদীর ডানতীরের ভাঙন হতে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলাধীন কাতলামারী ও সাঘাটা উপজেলাধীন গোবিন্দি এবং হলদিয়া এলাকা রক্ষা প্রকল্প’-এর কাজ বাস্তবায়ন করছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বিভাগ।
এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ কোটি ৫২ লাখ ৮২ হাজার ৬৯২ টাকা ৭১ পয়সা। ‘কাতলামারী-০১/২০২০-২১/লট-১’ প্যাকেজের এই কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেড।
তফসিল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে এই প্রকল্পের সমস্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
এলাকাবাসীর স্পষ্ট ক্ষোভ ও আশঙ্কা—পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে যদি এভাবে নামমাত্র ও নিম্নমানের কাজ চলতে থাকে, তবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে যমুনার সামান্য স্রোতেই আস্ত বাঁধ ধসে পড়বে। এর ফলে কাতলামারী ও সংলগ্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ আবারও নদীভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার চরম আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়সারা আশ্বাস দেন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, কাজটি সময় মতো শেষ হলে নদীপারের হাজারো মানুষ ও বসতি ভাঙনের দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক থেকে রক্ষা পাবে তবে লোক দেখানো আশ্বাসের বাইরে যদি এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে কোটি কোটি টাকার এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না।
পড়ুন:মাথায় কাফন বেঁধে অবরোধ, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ট্রেন চলাচল বন্ধ
ইমি/


