বিক্রি কমায় সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধ করছে টেসলা

প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি না হওয়ায় বৈদ্যুতিক পিকআপ ট্রাক সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের কারখানায় গাড়িটির উৎপাদন বন্ধ করা হবে। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় চালকবিহীন ট্যাক্সি সাইবার ক্যাবের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। টেসলার এই সিদ্ধান্তকে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কৌশলের বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানান টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক। তিনি জানান, সাইবার ট্রাকের উৎপাদন কমিয়ে আনলে একই কারখানায় সাইবার ক্যাব তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে সাইবার ট্রাকের উৎপাদন অন্য কোনো কারখানায় স্থানান্তর করা হবে, নাকি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো সাইবার ট্রাকের নকশা প্রকাশ করে টেসলা। প্রচলিত পিকআপ ট্রাকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌণিক নকশা এবং স্টেইনলেস স্টিলের বহিরাবরণের কারণে গাড়িটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নকশা প্রকাশের পর থেকেই গাড়িটি নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

২০২৩ সালের শেষ দিকে গ্রাহকদের কাছে সাইবার ট্রাক সরবরাহ শুরু করে টেসলা। সে সময় ইলন মাস্ক বছরে আড়াই লাখ গাড়ি বিক্রির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

গাড়িবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেলি ব্লু বুকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ২০ হাজার ২৩৭টি সাইবার ট্রাক বিক্রি করেছে টেসলা। অথচ ২০২৪ সালে গাড়িটির বিক্রি ছিল ৩৮ হাজার ৯৬৫টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। বিক্রির এই বড় পতনই গাড়িটির ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাইবার ট্রাকের মান ও নিরাপত্তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনএইচটিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, বাজারে আসার পর থেকে গাড়িটি ১১ বার প্রত্যাহার বা রিকলের মুখে পড়েছে।

এসব ঘটনায় বিভিন্ন গাড়ির যান্ত্রিক ও অন্যান্য ত্রুটি সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে। কিছু গাড়ি মেরামত করতে হয়েছে, আবার কয়েকটির সমস্যা সফটওয়্যার হালনাগাদের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। ফলে গাড়িটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

ইউরোপের বাজারেও সাইবার ট্রাক প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। গাড়িটির ধারালো স্টেইনলেস স্টিলের বহিরাবরণ ও নকশা পথচারীদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ইউরোপীয় বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গাড়িটির অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বড় একটি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।

সাইবার ট্রাকের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি চালকবিহীন ট্যাক্সি সাইবার ক্যাবকে ভবিষ্যৎ ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় টেসলা। প্রচলিত গাড়ির তুলনায় সাইবার ক্যাবের নকশা ও প্রযুক্তিতে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।

গাড়িটিতে প্রচলিত স্টিয়ারিং হুইল, প্যাডেল ও আয়না রাখা হয়নি। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলের উপযোগী করেই এটি তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ গাড়ি চালানোর জন্য আলাদা কোনো চালকের প্রয়োজন হবে না—এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিন শহরে সীমিত পরিসরে অর্থের বিনিময়ে সাইবার ক্যাবে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। তবে গাড়িটির নিরাপত্তা মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে এখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত টেসলার ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবট এবং চালকবিহীন পরিবহন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও কার্যক্রম বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে সাইবার ক্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা। কারণ চালকবিহীন গাড়ির প্রযুক্তি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া এ ধরনের গাড়ির বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।

এ অবস্থায় সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধ করে সাইবার ক্যাবের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সাইবার ক্যাবের বাজার তৈরি হতে সময় লাগলে সাইবার ট্রাকের বিক্রি থেকে তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হতে পারে।

সব মিলিয়ে সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত টেসলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একদিকে প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় জনপ্রিয়তা হারানো একটি মডেল থেকে সরে আসছে প্রতিষ্ঠানটি, অন্যদিকে ভবিষ্যতের পরিবহন প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চালকবিহীন গাড়ির ওপর জোর দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সাইবার ক্যাবের মাধ্যমে টেসলা নতুন ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করতে পারে কি না।

পড়ুন:ঢাকায় আসছেন যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের সদস্য ডাচেস অব এডিনবার্গ

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন