মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুর গ্রামে ইটভাটার পাশেই অবস্থিত জামিয়াতুস সুন্নাহ কোমরপুর মাদ্রাসা। একই স্থানে ইটভাটা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় পরিবেশদূষণ এবং শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহলে। তাঁদের আশঙ্কা, ইটভাটার কার্যক্রম শুরু হলে নির্গত কালো ধোঁয়া, ধুলাবালি ও ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাবে মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোমরপুর গ্রামের জামিয়াতুস সুন্নাহ মাদ্রাসার পাশেই গড়ে উঠেছে এসএমবি ব্রিকস নামের ইটভাটা। বর্তমানে সেখানে ইট তৈরির প্রস্তুতি ও কাঁচা ইট সাজানোর কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মৌসুমে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম শুরু হলে ভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও আশপাশে ছড়িয়ে পড়া ধুলাবালি মাদ্রাসার স্বাভাবিক পরিবেশকে আরও দূষিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
মাদ্রাসাটিতে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। শিক্ষকরা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এত কাছাকাছি ইটভাটা থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে ইটভাটার কার্যক্রম চলাকালে পরিবেশদূষণের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় বলে জানান সচেতন মহলের অনেকে।
কয়েকজন শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিষ্ঠানের পাশেই ইটভাটা থাকায় তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটা থেকে নির্গত সূক্ষ্ম ধূলিকণা ও বায়ুদূষণকারী বিভিন্ন উপাদান মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুদের শ্বাসতন্ত্র তুলনামূলক সংবেদনশীল হওয়ায় দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে অবস্থান করলে শ্বাসকষ্ট, কাশি, চোখের জ্বালাপোড়াসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ইটভাটা থাকলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়।
দেশের প্রচলিত ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সংরক্ষিত ও বিশেষ স্থাপনার আশপাশে ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিশেষ স্থাপনার সীমানা থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রাখার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
এ অবস্থায় জামিয়াতুস সুন্নাহ কোমরপুর মাদ্রাসার পাশেই এসএমবি ব্রিকসের পাশাপাশি অবস্থান কীভাবে এবং কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর মেহেরপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শেখ কামাল মেহেদীর সঙ্গে এসএমবি ব্রিকসের মালিক মশিউর রহমানের গোপন সখ্যতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন ইটভাটা মালিকের দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে জেলার কয়েকজন ইটভাটার মালিকের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কিছু ইটভাটা নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা না নিয়ে টার্গেট করে হাতেগোনা কয়েকটি ইটভাটায় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ইটভাটা মালিক বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শেখ কামাল মেহেদীর সঙ্গে কিছু ইটভাটার মালিকের বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি, নিয়মবহির্ভূতভাবে কিছু ইটভাটা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলেও অন্যত্র অভিযান চালিয়ে নিজেদের কার্যক্রম প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, এসএমবি ব্রিকসের পাশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও ইটভাটাটির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
ইটভাটা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে সরাসরি এসএমবি ব্রিকসে গিয়ে মালিক মশিউর রহমানকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর মেহেরপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শেখ কামাল মেহেদী বলেন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে তাঁদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আগামী সপ্তাহেও আরও অভিযান পরিচালনা করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ আইন অনুযায়ী যেসব স্থানের আশপাশে ইটভাটা স্থাপন করা নিষিদ্ধ, সেসব বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনবহির্ভূত ইটভাটাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ যেসব স্থানে আইন অনুযায়ী ইটভাটা স্থাপন করা নিষিদ্ধ, সেসব স্থানে অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শুধু আশ্বাস নয়, কোমরপুরের জামিয়াতুস সুন্নাহ মাদ্রাসার পাশে অবস্থিত এসএমবি ব্রিকসের প্রকৃত অবস্থান, বৈধতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সরেজমিনে যাচাই করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
পড়ুন : বড়লেখায় ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন


