বিজ্ঞাপন

সম্মানজনক স্বীকৃতি আত্মতৃপ্তি ও কর্মস্পৃহা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয় : নাট্যজন কামরুজ্জামান বালার্ক

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পদক মেডাল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া (OAM) অর্জন করেছেন মেলবোর্নপ্রবাসী নাট্যজন কামরুজ্জামান বালার্ক। গত ২৭ মার্চ বিশ্বনাট্য দিবসে তাকে সংবর্ধনা দিয়েছে ঢাকার নাট্যদল স্বপ্নদল। তার অনুভূতি, পথচলা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রবাসে নাট্যচর্চা নিয়ে নাগরিক টিভি অনলাইনের সাথে একান্তে কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ার সম্মাননা ও নির্বাচনী বিষয় নিয়ে কিছু বলুন।

উত্তর : মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া (OAM) একটি অত্যন্ত সম্মানজনক জাতীয় পুরষ্কার যা প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারী অস্ট্রেলিয়া ডে-তে ঘোষণা করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে কোন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। যেমন : শিল্প -সংস্কৃতি, সমাজ সেবা, ব্যবসা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, শিক্ষকতা, সামরিক ক্ষেত্রে অবদান ইত্যাদি। রাজার প্রতিনিধি হিসেবে গভর্ণর জেনারেল এই ঘোষণা দিয়ে থাকেন এবং নির্দিষ্ট একটি দিনে একটি আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পদকটি প্রদান করা হয়। অস্ট্রেলিয়াতে এটি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক, এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে। এটির মনোনয়ন প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও চূড়ান্ত করতে ৩/৪ বছর সময় লাগে। একজন ব্যক্তির দীর্ঘদিনের মেধা, মনন ও ধারাবাহিক অবদান কোন বিশেষ ক্ষেত্রে এই পদক প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন : সম্মানজনক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কী রকম?

উত্তর: যে কোন সম্মানজনক স্বীকৃতি আত্মতৃপ্তি ও কর্মস্পৃহা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়, আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তবে বলতে দ্বিধা নেই আমি মনের আনন্দে ও সামাজিক দায়বদ্বতা থেকেই শিল্পচর্চা করি, কখনও পদক প্রাপ্তির কথা ভাবিনি। এক জীবনে আমি শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছি: লেখালেখি, সম্পাদনা, সাংস্কৃতিক ফোরাম ও সামাজিক সংগঠক- সবই ভালোবেসে ও সমকালের দায় মেটাতে- আমার আমিকে সপে দিয়েছি এক মানবিক পৃথিবী গড়ার কাজে।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়াতে বাংলা নাট্যচর্চার কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।

উত্তর : অস্ট্রেলিয়াতে বাঙ্গালীর অভিবাসন শুরু হয়েছে ৭০ দশকের গোড়ার দিকে। হাঁটিহাঁটি পা পা করে বাঙ্গালীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে, শিল্পচর্চার পরিধিও বেড়েছে। এখানকার বড় বড় শহরগুলোতে বাঙ্গালীদের বসবাস: সিডনী, মেলবোর্ন ব্রিজবেন, পার্থ, ক্যানবেরা ও এডেলাইডে আবাস গড়েছেন সবাই। প্রথম থেকেই সংস্কৃতিমনা বাঙ্গালীরা বিশেষ দিনে ছোট ছোট অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকতো। নাটকের জন্য দর্শক তৈরির ক্ষেত্রেও এই আয়োজন বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিদেশে থিতু হওয়া সাংস্কৃতিক কর্মীরা এক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা রাখে। প্রথম দিকে বাংলাদেশ সমিতি বা ব্যাঙ্গুলী এসোসিয়েশন বার্ষিক নাটক করতো, এখন দুই বাংলার বাঙ্গালীদেরই নিজস্ব নাটকের দল আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যৌথভাবে দুই বাংলার নাট্য শিল্পীরা একত্রে কাজ করছেন। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পুরনো নাটকের দল ‘রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি, মেলবোর্ন’ যা ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে। এ পর্যন্ত ২১ টি পূর্নাঙ্গ নাটক মঞ্চস্থ করে। এই দলের গোড়া পত্তনে আমার ছিলো বিশেষ ভূমিকা, দীর্ঘ ২০ বছর আমি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। মেলবোর্নে বেশ ক’টি নাটকের দল আছে: রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি, কথক, বাংলা থিয়েটার, এক্টোমেনিয়া ও ছায়ানট ইত্যাদি। তাছাড়া কিছু কিছু আবৃত্তির দলও মাঝে মাঝে নাট্য প্রযোজনার কাজে সম্পৃক্ত আছে। সিডনিতে বেশ ক’টি নাটকের দল কাজ করছে যেমন: শখের থিয়েটার, আলাপন, মঞ্চ শ্রমিক ইত্যাদি। অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতেও নাট্যচর্চা হচ্ছে, তবে নিয়মিত নয়।

প্রশ্ন : আপনার দলীয় নাট্যচর্চা ও সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনা ‘অচলায়তন’ নিয়ে বলুন।

উত্তর: ‘অচলায়তন’ আমদের একটি মাইলস্টোন প্রযোজনা- এতে অংশগ্রহণ করে দেশ-বিদেশের ৬৫ জন কুশীলব- দুই বাংলার নাট্যকর্মীরা এতে অংশ নেয়। মূল নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করে ঢাকা থেকে ‘স্বপ্নদল’ অধিকর্তা জাহিদ রিপন। এই নাটকের নির্মাণ খরচ অনেক, দীর্ঘদিনের অনলাইন ও অফলাইন মহড়া। নাটকের সেট করেছেন শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চ ব্যবস্থাপক ফজলে রাব্বি ও কস্টিউম ডিজাইন করেছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাকি তারা, নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন শান্তি নিকেতন ফেরত পূরবী চৌধুরী আর সংগীত পরিচালনায় মোরশেদ জামি। নৃত্যের সাথে আমরা সব গান লাইভ করেছি যা হারমোনাইজ করা ছিলো বেশ কষ্টসাধ্য। এই নাটক প্রযোজনার পেছনের গল্প ও বাঙ্গালীর মনের অচলায়তন ভাঙার এক ভিন্নধর্মী আয়োজন নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি ডকুমেন্টারী যেখানে বাংলা-ভাগ ও বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয় উঠে এসেছে। ‘তৃতীয় ভূবন’ নামের এই ডকুমেন্টারিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশ নিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। বর্তমানে এটি অস্ট্রেলিয়ার SBS Prime tv তে দেখানো হচ্ছে। এই প্রযোজনাটি ছিলো আমার একটি ড্রিম প্রজেক্ট, আমি এতে প্রযোজনা অধিকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করি ও মহাপঞ্চকের চরিত্রে অভিনয় করি।

প্রশ্ন : স্বপ্নদলের সংবর্ধনা ও মেলবোর্নে ‘হেলেন কেলার’ আমন্ত্রন প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

উত্তর : আমার পদক প্রাপ্তি মূলতঃ রেনেসাঁর জন্য একটি বড় স্বীকৃতি, কারন আমার শিল্পচর্চার কেন্দ্রবিন্দুই হলো রেনেসাঁ। রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি এই পদক প্রাপ্তি স্মরনীয় করে রাখতে একটি ভিন্নধর্মী উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে যেখানে রেনেসাঁর বাহিরে আমাদের সুহৃদদের আমন্ত্রন জানানো হয়েছে, বিশেষ করে যারা আমাদের শিল্প সারথী। সিডনী-মেলবোর্নের বাহিরে ‘স্বপ্নদল’ আমাদের সেই শিল্পসারধিদের মধ্যে অন্যতম। আমরা মনে করেছি রবীন্দ্রনাথকে উপজীব্য করে স্বপ্নদলের এই সফল প্রযোজনা ‘হেলেন কেলার’ মেলবোর্নে সংস্কৃতি প্রিয় বাঙালীদের দেখার সুযোগ করে দিলে দুই দলের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে যা আগামীর যৌথ শিল্পযাত্রাকে আরো বেগবান করবে, রেনেসাঁর নাট্যকর্মীরা বিভিন্নভাবে উপকৃত হবে। ৬ জুনের ‘হেলেন কেলার’-এর এই প্রদর্শনীর জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার আগামীর সাংস্কৃতিক বিনিময় ভাবনা নিয়ে কোনো ভাবনা থাকলে বলুন।

উত্তর: রেনেসাঁর দেখাদেখি অন্যান্য সংগঠনও যৌথ প্রযোজনায় এগিয়ে আসবে বলে আমাদের ধারনা। বিদেশে দেশীয় সংস্কৃতিচর্চায় সীমাবদ্বতা আছে, যৌথ প্রযোজনা সেখানে আশার আলো দেখাবে বলেই মনে করি। গেল বছর আমেরিকার একটি অভিবাসী নাটকের দলও যৌথ প্রযোজনায় এগিয়ে এসেছে। ভালো ও মান সম্পন্ন প্রযোজনায় যৌথ প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি। নিউইয়র্ক প্রবাসী নাট্যজন শামসুল আলম বকুলের অধিকারিত্বে বিশ্বজুড়ে ৩৭ টি অভিবাসী বাংলা নাটকের দল নিয়ে Theatre Support Group নামে একটি সংগঠন তৈরি হয়েছে যা যৌথ শিল্প প্রয়াসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রেনেসাঁ ইতিপূর্বে এই ধরনের আরো অনেক উদ্যোগে অংশীজন হয়েছে। নাট্যজন মামুনুর রশিদের নেতৃত্বে বাংলা থিয়েটার দু’বার মেলবোর্নে পারফর্ম করেছে, মেলবোর্ন-সিডনী ও ঢাকার অংশগ্রহনে নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে। আগামীতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

প্রশ্ন : নাটকের পাশাপাশি সাহিত্য ও সামাজিক উদ্যোগেও যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা ঠিক কী রকম?

উত্তর: আমি শিল্পচর্চার বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকদিন ধরেই কাজ করি। সত্তর দশকের শেষ দিকে ঢাকায় থাকতে আমি একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। ‘চিত্রিতা’ নামের এই সংকলনটি ৩/৪ বছর বের করছি। সেই সময় ‘অপেরা’ নামের একটি নাটকের দলের হয়ে মঞ্চেও কাজ করেছি। প্রবাসে সামাজিক সংগঠনের হয়ে বাংলাদেশ সমিতিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়ে নাট্যদল করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আবার লেখালেখি যেহেতু আমার মজ্জাগত অনুষঙ্গ সেটির চর্চা করতে গিয়ে একবার সুনীল গাঙ্গুলীকে নিয়ে মেলবোর্নে একটি অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ‘বাংলা সাহিত্য সংসদ’ গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। সেই সংগঠনটি আজো চলছে- প্রতি বছর দুই বাংলার প্রথিতযশা সাহিত্যিকরা এতে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিচ্ছে। একটি সুন্দর সংকলনও প্রতি বছর বের হচ্ছে। বেশ ভালো কাজ হচ্ছে। পত্রিকা প্রকাশের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও প্রবাসী সামাজিক সংগঠনের বার্ষিক সংকলন বের করতে গিয়ে পত্রিকা প্রকাশের ভূত মাথায় চাপে। আরো কয়েকজন সমমনা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো লোকের সান্নিধ্যে এসে ‘শেকড়’ প্রকাশে উদ্যোগী হই। সত্যিকার অর্থেই ‘শেকড়’ একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ছিলো যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লেখকদের একটি মিলনমেলা হয়ে উঠেছিলো। আমরা ৬/৭ বছর এটি প্রকাশ করেছিলাম, যেখানে একজনের নাম না নিলেই নয় ছোটভাই ও বন্ধু সজীব জায়েদী – যার হাড়ভাঙ্গা খাটুনির জন্য পত্রিকাটি আলোর মুখ দেখেছিলো। প্রবাসে থেকে অনুভব করেছি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের মত প্রবাসীদের করার অনেক কিছু আছে। সেই ধারনা থেকেই রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটির উদ্যোগে ২০০৬ সালে মেলবোর্নের সব সামাজিক -সাংস্কৃতিক ফোরাম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা হয় Bangladesh Disaster Relief Fund (BDRF) যার মাধ্যমে বাংলাদেশের যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও আমরা এগিয়ে যাই। যেমন: Bushfire Appeal এ Australian Red Cross এর জন্য Fund তোলা ইত্যাদি। বাংলাদেশে সর্বশেষ নোয়াখালীর বানভাসী মানুষের জন্য আমরা ত্রানসামগ্রী প্রেরণ করি। কোভিডের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রান তৎপরতা চালাই ইত্যাদি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের জন্য আপনার কাছ থেকে যে আশার কথা শোনা যেতে পারে।

উত্তর: শিল্পচর্চা হবে স্বতঃস্ফূর্ত, বাধা বন্ধনহীন। শিল্পে নান্দনিকতার পাশাপাশি সমকালকে ধারন করতে হবে। জগত জুড়ে শিল্পের শতফুল ফুটুক। মনের কালিমা দূর করতে ও মানবিক পৃথিবী গড়তে এর কোনো বিকল্প নাই। আমরা অর্থনীতির খেলায় কপর্দকহীন হয়তো, মেধায় মননে শিল্প চয়নে নয়তো!

পড়ুন : অভিনয় ছাড়াও নিজেকে আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে হয়েছে: ববি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন