বাংলার জয়যাত্রাকে কেন হরমুজ প্রণালী পার হতে দিচ্ছে না ইরান? কয়েকবার চেষ্টা করার পরও জাহাজটি পার হতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতির সরাসরি প্রভাব এবার পড়েছে বাংলাদেশের সমুদ্রপথে বাণিজ্যে। এর ফলে দেশটির অনুমতি না পাওয়ায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ প্রণালিটি অতিক্রম করতে পারছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, জাহাজটির নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
রোববার তুরস্কে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহর কাছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উত্থাপন করেন। তিনি দ্রুত অনুমতি দিয়ে জাহাজটিকে হরমুজ পার হতে সহযোগিতার আহ্বান জানান। এদিকে একই কারণে সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা আরেকটি জাহাজের। কিন্তু সেটিও যাত্রা করতে পারেনি। এতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন বাংলার জয়যাত্রা বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত উপকূলের কাছে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বহনকারী জাহাজটি হরমুজ পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই দফা চেষ্টা করেও ইরানের নৌবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
তবে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশি জাহাজের ক্ষেত্রে এমন কঠোর অবস্থান নিচ্ছে তেহরান?
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে তৈরি হওয়া অস্বস্তি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করা হলেও হামলার মূল উৎসের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এতে ইরান অসন্তুষ্ট হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেওয়া বাংলাদেশের শোকবার্তাও তেহরানের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এমনকি ঢাকায় ইরানের দূতাবাসে শোক বইতে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্বাক্ষর না করায় অসন্তোষ আরও বাড়ে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থানের সামান্য বিচ্যুতিও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয় এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হোক বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না। বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা নিহত হন। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের মধ্যেই হরমুজ প্রণালী কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত সামরিক করিডরে পরিণত হয়।
এরই মধ্যে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য পরিবহনের কাজ শেষ করে হরমুজ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ইরানি কর্তৃপক্ষ জাহাজটির আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
বর্তমানে জাহাজটি নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে এবং নতুন নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল না হলে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি


