বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)- তে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সংস্থার প্রবিধান লঙ্ঘন করে কিছু কর্মকর্তার নিয়োগ ও পদোন্নতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে বিপিসি চেয়ারম্যানের পিএস পদটি বিশেষভাবে আলোচিত।
নাগরিকের হাতে আসা তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে জানা যায়, ২০১৯ সালে শ্বশুর তথা বরিশালের চেয়ারম্যান সামছুর রহমানের মাধ্যমে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ পান মো. আহম্মুদুল্লা। অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির প্রবিধানমালা উপেক্ষা করে এবং নিজ জেলা বরিশালের ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার দিবারকাটি হওয়া সত্ত্বেও পরিচয় গোপন করে তিনি ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, আহম্মুদুল্লার শ্বশুর সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পিএস পদে সুবিধা-সুবিধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তিনি বিপিসির প্রবিধান উপেক্ষা করে নিচের পদ থেকে পিএস পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন । জানা যায়, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রণালয় এবং উর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করে তিনি শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে তার নামে ফ্ল্যাট, মিরপুরে একাধিক রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন ব্যাংকে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে বেনামে সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ ২০২১ সালে তাকে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে হিসাব বিভাগে বদলির আদেশ দিলেও সেই অফিস আদেশ পরবর্তীতে বাতিল হয়ে যায় এবং তিনি স্বপদে বহাল থাকেন।
অবাক করার বিষয়, তার প্রভাব বলয় অক্ষুণ্ণ রাখতে বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউজ, লিয়াজো অফিস এবং বিপিসির অধীনস্থ কোম্পানির ডিপোতে স্থায়ী ও অস্থায়ী পদে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা অফিস ও রেস্ট হাউজের ক্রয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিক শাহরিয়ার, রেস্ট হাউজ ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান, চেয়ারম্যানের পিএ নুসরাত ইসলাম এবং পরিচালক অপারেশন্স ও পরিকল্পনার পিএ নুসরাত ইসলাম অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, মো. আহম্মুদুল্লার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিপিসির উপ-ব্যবস্থাপক আশিক শাহরিয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। নিজ জেলা বরিশাল হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা কোটায় বিপিসিতে যোগদান করেন তিনি। বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ যোগ্যতা না থাকায় তাকে এসিআও পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়ে পদোন্নতি দিতে চাননি। তবে পিএস আহম্মুদুল্লার প্রভাবের কারণে ৩ বছর ১৭ দিনে তিনি পদোন্নতি লাভ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মো. আহম্মুদুল্লা ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সকল নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। পাশাপাশি বিপিসির ব্যাংক হিসাবের এফডিআর ও এসএনডি ব্যবস্থায় তার পছন্দের ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেখান থেকে মোটা অংকের মাসোহারা গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়। বেসরকারি রিফাইনারিগুলো থেকেও মাসোহারা গ্রহণ এবং আত্মীয়-স্বজনদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মো. আহম্মুদুল্লার বিরুদ্ধে।
এছাড়া এসপিএম প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পসহ বিপিসির চলমান প্রকল্পগুলো থেকে কমিশন বাণিজ্য এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে মো. আহম্মুদুল্লার বিরুদ্ধে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিপিসির একমাত্র রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে প্রতি বছর অ্যালোকেশন অনুমোদন দেওয়া হতো, যার ফলে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি হতো। সেখান থেকেও মোটা অংকের সুবিধা গ্রহণ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. আহম্মুদুল্লার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী জানান, তেল খাতসহ বিভিন্ন খাতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান নাগরিককে জানান, সরকার পরিবর্তন হলেও এই সেক্টরের বিশাল অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা রহস্যজনক। তিনি বলেন, তেল খাতসহ বিভিন্ন খাতে ঘুষ-দুর্নীতি এখনো স্বাভাবিক বিষয় । সরকার এসব ব্যাপারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে জনমত গঠন করে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দুদকে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্বে উচ্চপর্যায়কে ম্যানেজের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলেও বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন উঠছে—দুদক কি এখনও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করছে? এ বিষয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা নাগরিককে জানান, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে।
পড়ুন:জকসুর ক্রীড়া সম্পাদককে থাপ্পড় মারা অভিযুক্ত নেলী বহিষ্কার
দেখুন:ইস্তাম্বুল: সোশ্যাল মিডিয়ার ছবির মতোই জাদুকরী? |
ইমি/


