টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জনের বাড়িই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই সাতজন রয়েছেন। ঘরে ঘরে এখন কান্নার আওয়াজ।
নিহতরা হলেন- রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আব্দুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮) মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০), পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের পরিবার এবং স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো গ্রাম। আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষরা এসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন নিহতদের স্বজনদের। স্বজন হারানোর ব্যাথায় স্তব্ধতার ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে অসহায় পরিবারগুলো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহতরা সবাই ফেরিওয়ালা ছিলেন। তারা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। পাশাপাশি নারীদের চুল ও পুরোনো মোবাইল ফোন সংগ্রহের কাজও করতেন। জীবিকার তাগিদে তারা দীর্ঘদিন ধরে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে ভাড়া বাসায় থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তারা রাজশাহীগামী একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সোলাইমান আলী বলেন, আমরা সবাই নোয়াখালীতে একই সঙ্গে ছিলাম। আমরা এক সাথেই ব্যবসা করতাম। তারা আমাদের আগের গাড়িতে উঠছিলো। আমিসহ আরও কয়েকজন পরের গাড়িতে ছিলাম। টাঙ্গাইল পার হওয়ার পর দেখি একটি গাড়ি উল্টে পড়ে আছে। যুমনা সেতু পার হওয়ার পরে জানতে পারি তারা মারা গেছে।
একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা নাসিরউদ্দিন বলেন, এরা সকলেই মৎসজীবী ছিলো। বিলের পানি যখন শুকিয়ে যায় তখন পেটের দায়ে বিভিন্ন প্লাস্টিক জাতীয় মালামাল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এর সকলেই হতদরিদ্র। আমাদের গ্রামে এক সঙ্গে এতো মৃত্যু কখনো দেখেনি কেউ। আমাদের গ্রাম না আশেপাশের এলাকাতেও এধরণের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। পুরো গ্রামে শোকের ছাঁয়া নেমে এসেছে। সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই এউ পরিবারগুলোকে যেনো আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা হয়।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের ফিরোজ হোসেন বলেন, উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে এ এলাকার শতাধিক যুবক বছরজুড়ে হরেক পণ্যের ব্যবসা করেন। ঈদের সময় বাসে বাড়ি ফিরতে জনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা গুনতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে অনেকেই পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। নিহতরাও একইভাবে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা খাতুন বলেন, বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদী কেনার কথাও বলেছিল। রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।
মান্দা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, নিহত ৯ জনের বাড়ি মান্দায় বলে সনাক্ত করা গেছে। আমাদের ধারণা নিহতদের মধ্যে আরও অনেকেই মান্দার থাকতে পারে। তারা সকলেই এক সঙ্গে নোয়াখালীতে ব্যবসা করতেন। বাকিদের পরিচয় সনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার (২৫ মে) ভোর ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতিতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা সকলেই পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদ করার উদ্দেশ্যে বাড়ি ফিরছিলেন।
পড়ুন- ট্রেনে ঈদযাত্রায় চরম ভোগান্তি: ৫ ট্রেনের বিলম্ব, যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়


