পবিত্র ঈদুল আজহা পরবর্তী কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে নেত্রকোনায় স্মরণকালের ভয়াবহ ধস নেমেছে। জেলা শহরের চামড়া সংগ্রহের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জামিয়া মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসা দিনভর শিক্ষক ও ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করলেও রাত অব্দি কোনো উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে পায়নি। নামমাত্র মূল্যে চামড়া কেনার প্রস্তাব দিলেও অনেক ব্যবসায়ী দরদাম করে শেষমেষ আর ফিরে সাড়া দিচ্ছেন না। এতে করে মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের অধীনে থাকা শত শত এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ভরণপোষণ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
নেত্রকোনা শহরের বারহাট্টা রোডে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসা। মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম জানান, ঈদের দিন সকাল থেকে মাদ্রাসার ওস্তাদ এবং ছাত্ররা মিলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চার শতাধিকের বেশি গরু চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া খাসির চামড়াও সংগ্রহ করা হয়েছে শতাধিক। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, গভীর রাত হয়ে গেলেও এসব চামড়া বিক্রির জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য কাস্টমার বা পাইকার পাওয়া যাচ্ছে না।
মাদ্রাসার মজলিসে আমেলা (কার্য নির্বাহী) সদস্য মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান জানান, “সারা দিন ৫০-৬০ জন ছাত্র এবং ২৫-৩০ জন ওস্তাদ হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে চামড়াগুলো সংগ্রহ করেছেন। এখন পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করার মতো কোনো কাস্টমার আমরা পাচ্ছি না। দু-একজন মৌসুমী ব্যবসায়ী এসে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দাম বলছেন। অথচ একেকটি কোরবানি পশুর মূল্য লাখ টাকার উপরে।”
স্থানীয় ভাসমান চামড়া ব্যবসায়ী আবু হানিফা বাদল সংকটের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “বাইরের কোনো বড় পার্টি বা পাইকার আমরা পাচ্ছি না। যার কারণে আমরা স্থানীয়ভাবে চামড়া কিনে চামড়াগুলো কোথায় বিক্রি করব তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। গত বছর যেখানে ৫৫০ থেকে ৬০০ বা ৬৭০ টাকা দরে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে, এবার সেখানে ৩০০ টাকার বেশি দাম বলাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।”
জামিয়া মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসার মুহতামিম (অধ্যক্ষ) মাওলানা আবুল কাশেম দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান, তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত আছেন। দীর্ঘ ৩৩ বছরের ইতিহাসে চামড়ার বাজারে এমন ভয়াবহ ও করুণ ক্রেতা সংকট তিনি আর কখনো দেখেননি।
তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে আমরা আসরের নামাজের আগেই অথবা সর্বোচ্চ মাগরিবের মধ্যে সব চামড়া ভালো দামে বিক্রি করে দিতাম। এবার রাত ১০টা বেজে গেলেও কোনো বড় ক্রেতার দেখা মেলেনি। সুনামগঞ্জের এক পাইকার, যাকে গত বছর আমরা ৬৭০ টাকা দরে চামড়া দিয়েছিলাম, সে এবার ৩০০-৩৫০ টাকা দাম বলছে। তাও আবার কাটা-ছেঁড়া, ছোট-বড় এবং গাভী গরুর চামড়া বাছাই করে নেওয়ার শর্ত দিচ্ছে।”
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, জামিয়া মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসায় বর্তমানে প্রায় ছয়শো জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে প্রায় তিনশো জনই অত্যন্ত দরিদ্র ও এতিম, যারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে খাওয়া-দাওয়া করে।
প্রতি বছর কোরবানির চামড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থই এই লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের বাৎসরিক আয়ের প্রধান একটি উৎস। চামড়াগুলো যদি সঠিক মূল্যে বিক্রি করা না যায়, তবে এতিম ও মেধারী গরিব ছাত্রদের সারা বছরের বিনামূল্যে খাবার জোগানো মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
সরেজমিনে, মাদ্রাসার আঙিনায় বিপুল পরিমাণ চামড়া স্তূপ করে রাখা হয়েছে। লবণ দিয়ে চামড়াগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা না করা হলে এবং সঠিক সময়ে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পারলে কোটি টাকার জাতীয় এই সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে মাদ্রাসাটি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চামড়া শিল্পের সংশ্লিষ্ট মহল ও সরকারের সুনজর কামনা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

