বিজ্ঞাপন

উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, তিনি ৮ থেকে ৯ জুন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ায় অবস্থান করবেন এবং সেখানে দেশটির নেতা কিম জং উন-এর সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করবেন।

বিজ্ঞাপন

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের রোববার পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ শুধু এই নয় যে দুই নেতা আবার সাক্ষাৎ করছেন। গত বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বেইজিংয়ে আয়োজিত বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজেও তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। বিশেষ বিষয় হলো, শি নিজেই উত্তর কোরিয়ায় সফরে যাচ্ছেন।

চীনা এই নেতা সর্বশেষ ২০১৯ সালে পিয়ংইয়ং সফর করেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বিদেশ সফর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো বিশ্বনেতারাই সাধারণত তার সঙ্গে দেখা করতে বেইজিংয়ে যান।

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং আল জাজিরাকে বলেন, ‘শি জিনপিং সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি বিদেশ সফর করেননি। এখন প্রবণতা হলো বিদেশি নেতারা বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।’

তিনি বলেন, ‘শি জিনপিং নিজে পিয়ংইয়ং সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটি দেখায় যে চীন এই সফরকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।’

এশিয়া সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শি বছরে গড়ে প্রায় ১৪টি বিদেশ সফর করেছেন। কিন্তু ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে বছরে গড়ে ছয়টিতে নেমে আসে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে তিনি মাত্র একটি বিদেশ সফর করেন এবং ২০২১ সালে কোনো বিদেশ সফরই করেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই শি এই সফরে যেতে পারেন।

ঐতিহাসিকভাবে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে বেইজিং ছিল জ্যেষ্ঠ অংশীদার। উত্তর কোরিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে ২০২২ সালের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে এই সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জনশক্তি সরবরাহ করেছে এবং পর্যবেক্ষকদের মতে, মস্কোর যুদ্ধযন্ত্র সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে সেনা মোতায়েন এবং গোলাবারুদ, কামানের শেল ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানির বিনিময়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র ৫৮০ মিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পণ্য আকারে পাওয়া গেছে। ফলে বাকি অর্থের বড় অংশ সামরিক প্রযুক্তি, নির্ভুল যন্ত্রাংশ বা এমন উপকরণ হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে, যা সহজে শনাক্ত করা যায় না।

যদিও চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, তবুও বেইজিং উত্তর কোরিয়ার হাতে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পৌঁছানো নিয়ে সতর্ক। চলতি বছরের শুরু থেকে উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে আটবার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। মে মাসে তারা নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রিত একটি কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও উন্মোচন করেছে।

এ সপ্তাহেই উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কিম জং উনের একটি নতুন ‘অস্ত্রমানের পারমাণবিক উপাদান’ উৎপাদন কারখরানা পরিদর্শনের ছবি প্রকাশ করা হয়। দেশটির দাবি, এই কারখানা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘গুণোত্তর হারে’ বাড়াতে সহায়তা করবে।

১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ১৯৫৩ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ স্থগিত হলেও শান্তিচুক্তি হয়নি। দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে কিম জং উন কোরিয়া একীকরণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পরিত্যাগ করার ঘোষণা দিলে সম্পর্ক আরও তলানিতে পৌঁছে। এরপর থেকে দুই কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগও অনেকটাই বন্ধ রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করে যে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপের বিভিন্ন ইস্যু সমাধানে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণমন্ত্রী চুং ডং-ইয়ং গত মাসে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশা করছেন শি ও কিম সম্ভাব্য কিম-ট্রাম্প বৈঠক নিয়েও আলোচনা করবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ব এশিয়ার সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও শির এই সফরের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক সহায়তা চুক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে।

চীন ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্বের স্মৃতি এখনও দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েও আপত্তি জানিয়ে আসছে বেইজিং।

এই প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

পড়ুন:আরব মিত্রদের পুনর্গঠনে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

দেখুন:আঙুর চাষে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন মোকছেদুলের | 

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন