বিজ্ঞাপন

শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ শিক্ষক, শিক্ষা অফিস এবং প্রশাসনের গাফলতিতে শিক্ষার মান শূন্যতে

শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্য করে চলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক, শিক্ষা অফিস এবং প্রশাসনের গাফলতিতে শিক্ষার মান শূন্যতে চলে এসেছে। সরকারী অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষার্থীরে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কোচিং ও প্রাইভেট বানিজ্যসহ সরকারী হোস্টেল দখল করে বসবাস করছে কর্মরত শিক্ষক। এই বিদ্যালয়ের অনিয়মের বিষয়ে একাধিকবার আইন শৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চারঘাটের সারদা পুলিশ একাডেমি পরিদর্শনে আসেন। প্রটোকল অনুযায়ী তিনি একাডেমি সংলগ্ন এই সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টিও পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি আকস্মিকভাবে দেখতে পান, বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জনাব মো: রিয়াজ উদ্দিন। কাকতালীয়ভাবে, এই রিয়াজ উদ্দিন সাহেব ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শৈশবের শিক্ষক (জিয়াউর রহমান তাঁর বাল্যকালে যে স্কুলে পড়েছিলেন, সেখানে রিয়াজ উদ্দিন সাহেব শিক্ষকতা করতেন)।

বহু বছর পর নিজের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেখে রাষ্ট্রপতি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং শিক্ষকের পা ছুঁয়ে সালাম করেন। এরপর তিনি শিক্ষকের কাছে জানতে চানতাঁর ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া বা কোনো উপহার লাগবে কি না। তখন সেই মহান শিক্ষক নিজের জন্য কোনো কিছু না চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ করেন, “আমার নিজের জন্য কিছু লাগবে না বাবা, তুমি যদি পারো আমার এই স্কুলটাকে সরকারি (জাতীয়করণ) করে দাও।” শিক্ষকের সেই নিঃস্বার্থ দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি তাৎক্ষণিক প্রতিশ্রুতি দেন এবং সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতাতেই ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

শত বছরের পুরাতন সরদহ সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টির শিক্ষার মানসহ বিবিধ অভিযোগ বয়ে বেড়াচ্ছে। রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। ঐতিহাসিক পদ্মা নদীর তীরে এবং বিখ্যাত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে এক শতাব্দী প্রাচীন গৌরবময় ইতিহাস।

প্রতিষ্ঠার পটভূমি (১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ) বিদ্যালয়টির গল্পটা শুরুর। ১৯১২ সালে ব্রিটিশ আমলে ঐতিহাসিক সারদা বা সরদহ অঞ্চলে ব্রিটিশ সরকার ‘পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার’ (বর্তমান বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি) স্থাপন করে। সেখানে কমর্রত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের সুশিক্ষার কথা চিন্তা করে তৎকালীন পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অধ্যক্ষ মেজর চামনী একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

অবশেষে ১৯১৬ সালের ১৪ নভেম্বর তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় “সরদহ এম. ই. জুনিয়র” নামে একটি জুনিয়র বিদ্যালয় হিসেবে এটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমান খেলার মাঠের দক্ষিণ কোণে একটি দৃষ্টিনন্দন লাল রঙের ভবন তৈরি করে স্কুলের ক্লাস শুরু হয়েছিল (পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের দিকে এই ঐতিহাসিক পুরাতন ভবনটি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়)। বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিনয় ভূষণ।

হাই স্কুল ও পাইলট স্কুলে রূপান্তর (১৯২৭ – ১৯৬০ এর দশক) সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং উচ্চশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯২৭ সালের ২ জানুয়ারি বিদ্যালয়টিকে হাই স্কুল বা উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি। বিদ্যালয়ের বর্তমান চিত্র ও গৌরব অবস্থান ও ক্যাম্পাস। বিদ্যালয়টি রাজশাহী-বাঘা রোডের পাশে সারদা বাজারের নিকটেই অবস্থিত। এর ক্যাম্পাসের মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৬.১৭ একর, যা বিশাল খেলার মাঠ এবং গাছপালা ঘেরা এক শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।

পরবর্তীতে ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে তৎকালীন সরকার যখন শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কিছু সুনির্দিষ্ট বিদ্যালয়কে বহুমুখী শিক্ষা কার্যক্রমের মডেল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য “পাইলট স্কিম” হাতে নেয়, তখন এই বিদ্যালয়টিকে “পাইলট স্কুল” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন থেকেই এটি ‘সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে এলাকায় সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে।

জাতীয়করণ বা সরকারি স্কুল হিসেবে যাত্রা (১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ) চারঘাট অঞ্চলের একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে এটি স্বীকৃতি পায় ১৯৮১ সালে। সারদা পুলিশ একাডেমির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের আন্তরিক তৎপরতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ প্রতিশ্রুতিতে ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়টিকে সম্পূর্ণ সরকারি বা জাতীয়করণ করা হয়। তখন এর নাম হয় “সরদহ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়”।

স্থানীয় সচেতন মহল, সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলেছেন. এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে হবে। বেশ কিছূ শিক্ষক আছেন যাদের কর্মদিবস ১০ থেকে ১৫ বছরের মতো। তাদের সিন্ডিকেটেই চলে এই বিদ্যালয়ের কার্যকলাপ। শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয় প্রাইভেট এবং কোচিং সিস্টেম পাঠদানে। অন্যথায় ভালো নাম্বার এবং পরিক্ষায় অকৃতকার্য করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রানালয়ের দ্রুত হস্তোক্ষেফ ছাড়া শত বছরের ঐতিহ্য ফিরে আসবে না।

শিক্ষা কার্যক্রমে দেখা যায়, বর্তমানে এখানে ৩য় শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদান করা হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখানে বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখা চালু রয়েছে।

সম্প্রতী বিদ্যালয়ের ফলাফল অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেনী পর্যন্ত বার্ষিক পরিক্ষার ফলাফলে তথ্য নিয়ে জানা যায়, ২০২৫-২৬ সালে প্রায় অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে। ৬ষ্ঠ (খ) শ্রেনীর মোট শিক্ষার্থী ৫১জন। যার মধ্যে সকল বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছে ২৩জন, ২ বিষয়ে ফেল করে উর্ত্তীন হয়েছে ১৮জন এবং ১০ জন অকৃতকার্য হয়েছে। ৬ষ্ঠ শ্রেনীর (ক) শাখায় মোট শিক্ষার্থী ৫১জন। যার মধ্যে সকল বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছে ২৬জন, ২ বিষয়ে ফেল পাশ করেছে ২৬জন এবং ০৮ জন অকৃতকার্য হয়েছে। ৭তম শ্রেনীর (ক) শাখায় মোট শিক্ষার্থী ৫৩জন। যার মধ্যে সকল বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছে ২০জন, ২ বিষয়ে ফেল করে পাশ করেছে ১৭জন এবং ১৬ জন অকৃতকার্য হয়েছে। ৭ম শ্রেনীর (খ) শাখায় মোট শিক্ষার্থী ৫২জন। যার মধ্যে সকল বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছে ১১জন, ২ বিষয়ে ফেল পাশ করেছে ২৫জন এবং ১৬ জন অকৃতকার্য হয়েছে। ৮ম শ্রেনী (ক) শাখায় ৭৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩২জন সকল বিষয়ে পাশ করেছে। ৩ বিষয়ে ফেল করে পাশ করেছে ২২জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ১৯জন। ৮ম (খ) শাখায় ৭৩ জনের মধ্যে ৩১ জন পাশ করেছে, ৩বিষয়ে ফেল করে উর্ত্তীন হয়েছে ২৭জন এবং ফেল করেছে ১৫জন। ৯ম শ্রেনীর (ক) শাখার মোট ছাত্র-ছাত্রী ৭৪জন। যার মধ্যে সকল বিষয়ে পাশ করেছে ৩৮জন। ৩বিষয়ে ফেল করে বিশেষ বিবেচনায় উর্ত্তীন হয়েছে ৩৪জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৬জন। অপরদিকে (খ) শাখায় মোট শিক্ষার্থী ৩১জন। সকল বিষয়ে পাশ করেছে ০১জন। ৩ বিষয়ে ফেল করে উর্ত্তীন হয়েছে ২১জন এবং অকৃতকার্য ৯জন।

বিদ্যালয়ের ফলাফলের মান উন্নয়নে প্রধান শিক্ষক সহ সহকারী শিক্ষকরা নিজ দাইএড়াতে লটারি পদ্ধতীকে দোষারোপ করছেন। বিদ্যালয়ের কলকাঠি নিজের ইচ্ছে মতো চালাচ্ছেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি জেলা প্রশাসক থাকলেও স্কুল প্রধান তার নিজ ক্ষমতা বলে সকল সিন্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তার প্রামন হিসাবে জানা যায়, সম্প্রতী স্কুল বার্ষিক পরিক্ষার ফলাফলের সিন্ধান্তও প্রধান শিক্ষক ও তার সহকারীরা নেতৃত্ব দিয়ে ফল প্রকাশ করে। সরকারী বরাদ্দের হিসাব গুলো কাগজ কলমে থাকলেও বেশির ভাগ বানোয়াট বিল-ভাইচার। যার বাস্তবতার কোন মিল খুজে পাওয়া যায় না।

তবে বর্তমান (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক খাতুনে রাহে নাজাত বিদ্যালয়ের বিষয়ে উদাশিনতার প্রকাশ করে বলেন, সব কিছু ঠিকঠাক আছে। তিনি এই বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বেই বার্ষিক পরিক্ষার ফলাফল সিট তৈরী করা হয়েছে। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন সহকারী শিক্ষক ইদ্রস। এই বিদ্যালয়ের অন্যান্য অভিযোগ বিষয় গুলো অনেব পূর্ব থেকেই চলমান রয়েছে।

একই ভাবে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) লাইলা আক্তার জাহান চারঘাট উপজেলা শিক্ষা অফিসে ছিলেন না। তবে একাডেমিক সুপারভাইজান রাহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারী স্কুলের সার্বিক বিষয়ে দেখেন উপ-পরিচালক। তবে বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই বিষয়ে দেখবেন রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা অফিস।

পড়ুন- মানবতাবিরোধী অপরাধ : হানিফসহ চারজনের পক্ষে যুক্তিতর্ক আজ

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন