কখনো প্রখর রোদ আবার কখনো বৃষ্টি, বৈরী আবহাওয়া ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। সৈকতে কমে গেছে পর্যটকের ভিড়, ফাঁকা হয়ে পড়েছে হোটেল-মোটেল, বাতিল হচ্ছে আগাম বুকিং। এতে করে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, বিনোদন ও সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পুরো পর্যটন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহের কারণে শহরজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। অতিরিক্ত চাপের কারণে মাঝেমধ্যে ট্রান্সফরমারেও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।
পিডিবি কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণী বলেন, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সরেজমিনে লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও ইনানী সৈকত এলাকায় দেখা গেছে, সাধারণ সময়ের তুলনায় পর্যটকের উপস্থিতি অনেক কম। সমুদ্রস্নান, বিচ বাইক, ঘোড়ায় চড়া, প্যারাসেইলিংসহ বিভিন্ন বিনোদন কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক মোমেন মোল্লা বলেন, প্ল্যান ছিল কয়েকদিন থাকবো। কিন্তু আবহাওয়ার অবস্থা আর বিদ্যুতের সমস্যার কারণে এক দিন আগেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী রাহাত ইসলাম বলেন, যে হোটেলে উঠেছি সেখানে ঠিক মতো বিদ্যুৎ থাকে না, বাইরে বেরিয়ে সময় কাটাচ্ছি। পর্যটন শহরের অবস্থা এমন বেহাল হওয়াটা কাম্য নয়।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম শিকদার বলেন, গত কয়েক দিনে ৫ থেকে ১০ হাজার পর্যটক তাদের সফর সংক্ষিপ্ত করেছেন কিংবা বুকিং বাতিল করেছেন। তার ভাষ্য, একজন পর্যটক সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের সফরে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় করেন। সে হিসেবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ইতোমধ্যে কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ঈদের পর পর্যটন মৌসুম কিছুটা চাঙা হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আবারও দুর্বল করে দিয়েছে। পর্যটকদের মানসম্মত সেবা দিতে হোটেল মালিকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কলাতলী এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী মুকিম আলী বলেন, অনেক অতিথি বুকিং বাতিল করছেন। কেউ দুই রাতের বদলে এক রাত থেকে চলে যাচ্ছেন। এতে করে হোটেল ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, পর্যটন শুধু হোটেল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এরসঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত। পর্যটক কমে গেলে তার প্রভাব ছোট দোকানি থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত সবার ওপর পড়ে।
এদিকে উত্তর বঙ্গোপসাগরে গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালার কারণে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকার জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিন আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারে পর্যটন খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল অন্তত ৫ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধান না হলে তাদের অনেকেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়বেন।


