বিজ্ঞাপন

জনস্বার্থে বদলি নাকি প্রশাসনিক নিপীড়ন, ৫৩০ দিনে ৭ বার বদলি

একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, আইনি পরিভাষায় যাকে বলা হয় নিয়মিত বদলি, যার অবস্থা ও পেক্ষাপট বিবেচনায় কয়েকটি নাম রয়েছে, যেমন প্রশাসনিক বদলি, জনস্বার্থে বদলি, পারস্পারিক বদলি ইত্যাদি। জনসেবা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক গতিশীলতা আনা এবং দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করার জন্য এই বিধান অত্যন্ত কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জনস্বার্থ শব্দবন্ধটি কি আসলেই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ব্যক্তি বিশেষের ক্ষোভ, প্রতিশোধ বা প্রশাসনিক নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ দিদার রসুল যিনি মাত্র আড়াই মাস পর অবসের যাবেন এমনই এক অমানবিক ও চরম উদ্বেগজনক ঘটনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যেখানে একজন সাধারণ কর্মচারী, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রের সেবায় বিলিয়ে দিয়ে মাত্র দুই কয়েক দিন পর স্বাভাবিক অবসরে (PRL) যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন এবং নিয়মানুযায়ী ইতিমধ্যে তাঁর অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধার জন্য আবেদনও সম্পন্ন করেছেন, জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে যখন তাঁর শান্তিতে বিদায় নেওয়ার কথা, ঠিক তখনই জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে তাঁকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। অবাক হওয়ার বিষয় এখানেই শেষ নয়, ৫৩০ কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ৭ বার বদলি করা হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ৭৫টি কর্মদিবস (আনুমানিক ৩ মাস ১৫ দিন কর্মদিবস) পর পর তার বদলির আদেশ জারি হয়েছে।

​কোনো অভিযোগ ছাড়া একজন কর্মচারীর সাথে এই ধরনের আচরণ যে চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং তাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হয়রানি করার প্রমাণ, তা এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। যা কোনো প্রশাসনিক যৌক্তিকতা বা মানবিকতার তোয়াক্কা না করে ঘন ঘন এই স্থান পরিবর্তন কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে না এবং এটি যে স্পষ্টতই এক ধরণের মানসিক ও প্রশাসনিক নির্যাতন, তা বোঝার জন্য কোনো আইন বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

​প্রশাসনিক এই খামখেয়ালিপনার শিকার ব্যক্তিটি কেবল একজন আসন্ন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীই নন, তিনি একজন গুরুতর অসুস্থ প্রবীণ মানুষ যিনি ইতিপূর্বে হৃৎপিণ্ডের বাইপাস সার্জারি (Open Heart Surgery) করিয়েছেন, তাঁর ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি হয়েছে এবং তিনি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল ও ক্রনিক রোগে আক্রান্ত।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, এই ধরনের রোগীদের জন্য মানসিক চাপ এবং ঘন ঘন পরিবেশ পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা যেকোনো মুহূর্তে তাঁর জীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে অবসরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন অসুস্থ মানুষকে যখন প্রতি দুই মাস পর পর নতুন কর্মস্থল, নতুন পরিবেশ এবং নতুন আবাসের খোঁজে দৌড়াতে হয়, তখন তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। পেনশনের ফাইল প্রসেস করার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁকে কর্মস্থল পরিবর্তনের গোলকধাঁধায় ফেলে প্রকারান্তরে তাঁর জীবনের শেষ সম্বল এবং অধিকারটুকু নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে জনস্বার্থে বদলি’র নামে প্রকৃতপক্ষে কার স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে এবং একজন মুমূর্ষু, অবসরের অপেক্ষায় থাকা কর্মচারীকে ঘন ঘন বদলি করলে জনগণের কী বিপুল কল্যাণ সাধিত হয়?

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ও বদলি নীতিমালার মূল স্পিরিট হলো মানবিকতা ও কার্যকারিতার ভারসাম্য এবং সাধারণত অবসরে যাওয়ার ১-২ বছর আগে কোনো কর্মচারীকে তাঁর সুবিধাজনক স্থানে পোস্টিং দেওয়া হয়, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে অবসরের প্রস্তুতি নিতে পারেন, কিন্তু এই ক্ষেত্রে নীতিমালার ন্যুনতম তোয়াক্কা না করে যখন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বারবার ব্যবহার করা হয়, তখন তা আর ‘জনস্বার্থ’ থাকে না, তা হয়ে ওঠে ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ’ বা শ্রেণিগত আক্রোশ চরিতার্থের হাতিয়ার, যা কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অপছন্দ অথবা কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার খেসারত হিসেবে যদি হয়ে থাকে, তবে তা গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য একটি কালিমালিপ্ত অধ্যায়।

​আমাদের সংবিধানে কর্মের অধিকার এবং নাগরিকের মৌলিক মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে এবং একজন কর্মচারী অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হতে পারে, তদন্ত হতে পারে, নিয়মানুযায়ী শাস্তি হতে পারে, কিন্তু ‘বদলি’ কোনো শাস্তি নয় এবং শাস্তিমূলক উদ্দেশ্যে বদলি করা আইনের দৃষ্টিতেও অবৈধ। অথচ, বর্তমান সংস্কৃতিতে বদলিকে অনেক সময় ‘শাস্তি’ বা ‘হয়রানি’র সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং বিগত এক বছরে ৫ বার বদলির ঘটনা প্রমাণ করে যে, এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কোনো সুষ্ঠু নীতি বা বিবেচনাবোধ কাজ করেনি, বরং এটি এক ধরণের প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র, যেখানে অধীনস্থ কর্মচারীদের দয়া বা আক্রোশের পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সৎ ও যোগ্য কর্মচারীদের মনোবল ভেঙে দেয় এবং প্রশাসনে চাটুকারিতার জন্ম দেয়। এই অমানবিকতার অবসান হওয়া জরুরি এবং সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারকদের বিবেচনা এবং নীতিমালার আলোকে ওই কর্মচারীর বর্তমান বদলি আদেশ অবিলম্বে বাতিল করে তাঁকে তাঁর পূর্বের কর্মস্থল বা সুবিধাজনক স্থানে রেখে শান্তিতে অবসর প্রক্রিয়ার কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হোক। একই সাথে, এক বছরে কেন এবং কোন স্বার্থে একজন অসুস্থ মানুষকে ৫ বার বদলি করা হলো, তার পেছনে কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অনিয়ম ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক এবং অবসরের পূর্ববর্তী সময়ে (যেমন শেষ ১ বছর) কর্মচারীদের বদলি সুরক্ষাকবচ বা বিশেষ আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত, যাতে কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন।

জনস্বার্থের অর্থ জনগণের কল্যাণ, কোনো নাগরিক বা কর্মচারীকে তিলে তিলে ধ্বংস করা নয়, একজন মানুষ জীবনের ৩০-তায় বছর রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখতে ঘাম ঝরিয়েছেন এবং জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, সহানুভূতি এবং সুষ্ঠু বিদায়, কিন্তু সম্মান তো দূরে থাক, উল্টো যদি তাঁকে অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রশাসনিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়, তবে তা সমগ্র ব্যবস্থার দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং এই অসুস্থ কর্মচারীর প্রতি হওয়া অন্যায়ের দ্রুত প্রতিকার করে প্রশাসন প্রমাণ করবে যে, তারা এখনো মানবিকতা ও ন্যায়ের পক্ষে সচল, কারণ জনস্বার্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিগত আক্রোশের এই কালো হাত ভেঙে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : বদলির এক মাস পরও নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি শজিমেক হাসপাতালের প্রধান সহকারী

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন