লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাটকীয় ফলাফল দেখা গেছে। প্রাথমিক ভোট গণনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া ডানপন্থি প্রার্থী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা মাত্র ১ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে বামপন্থি প্রার্থী ইভান সেপেদাকে পেছনে ফেলেছেন। চূড়ান্ত ফলাফল এখনও ঘোষণা না হলেও তার সমর্থকেরা ইতোমধ্যে বিজয় উদযাপন শুরু করে দিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া দে লা এসপ্রিয়েলা অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক পাচার এবং অপরাধ দমনে কঠোর সামরিক অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বামপন্থি প্রার্থী ইভান সেপেদাকে পরাজিত করেছেন বলে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে। সেপেদা বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
জয়ের পর দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, ‘আজ আমাদের দেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। এটি এমন একটি অধ্যায়, যা গড়ে উঠেছে লাখো নাগরিকের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। তারা একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সুযোগে ভরপুর কলম্বিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন।’
৯৯ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, রান-অফ নির্বাচনে দে লা এসপ্রিয়েলা প্রায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে সেপেদা পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।
তবে সেপেদা এখনও পরাজয় স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, প্রাথমিক ফলাফল ‘এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি’। তিনি বলেন, ‘সরকারি গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে যে ফলাফল আসবে, আমরা সেটিকেই স্বীকৃতি দেব।’
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩১ মে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটের ক্ষেত্রেও যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক ফলাফলের সঙ্গে খুব সামান্য পার্থক্য দেখা গিয়েছিল। ক্যারিবীয় উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়ে ওঠা দে লা এসপ্রিয়েলা ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন।
বিবিসি বলছে, প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পর উপকূলীয় শহর বাররানকিয়ায় জড়ো হওয়া হাজারো সমর্থকের সামনে বক্তব্য দেন দে লা এসপ্রিয়েলা। নিজেকে ‘এল টাইগ্রে’ (বাঘ) নামে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ রাত থেকেই জাতির জন্য নতুন ইতিহাসের সূচনা হচ্ছে। আজ একটি নতুন যুগ শুরু হলো, নতুন এক পরিবর্তনের শুরু হলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব কলম্বিয়ানদের জন্য কাজ করব। যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, তাদের জন্যও, আর যারা অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তাদের জন্যও’। একই সঙ্গে তিনি ১৯৯১ সালের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং এটি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
তার সমর্থকদের অনেকেই কলম্বিয়ার হলুদ ফুটবল জার্সি পরে জাতীয় পতাকা হাতে উদযাপনে অংশ নেন। কিছু সমর্থক ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের ব্যবহৃত টুপির মতো টুপি পরে ছিলেন। তবে সেখানে লেখা ছিল, ‘মেক কলম্বিয়া গ্রেট অ্যাগেইন।’
এদিকে ফলাফল প্রকাশের পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘সে জিতেছে, বড় জয়!’
অন্যদিকে সেপেদার সমর্থকরাও বাররানকিয়ার রাস্তায় নেমে ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেপেদার সমর্থক শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী ক্যাটালিনা লা গ্রান্দে বিবিসিকে বলেন, ‘চারপাশে অস্বস্তির অনুভূতি স্পষ্ট।’
তিনি বলেন, ‘এত অল্প ব্যবধানের ফলাফল আমাদের উদ্বিগ্ন করছে। কারণ এটি দেশের গভীর বিভক্তি এবং গণতন্ত্র, শান্তি ও মানুষের অধিকার রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন।’
মারিয়া নামে আরেক সমর্থক বলেন, ফলাফল দেশের বিভক্তির চিত্র দেখালেও মানুষ শান্তিপূর্ণ আচরণ করেছে। তিনি বলেন, ‘এত রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেও রাস্তায় কোনও সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি, এটি ইতিবাচক।’
দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেশজুড়ে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যদি কোনও পক্ষ ফলাফল মেনে না নেয়।
রোববার রাতে দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালি থেকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। দে লা এসপ্রিয়েলার জয়ের প্রতিবাদে কিছু বিক্ষোভকারী মার্কিন পতাকা পোড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোও ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘প্রাথমিক গণনার ভিত্তিতে কাউকেই এখনও প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা যায় না।’
তিনি ভোট গণনার সফটওয়্যার নিরীক্ষার দাবি জানান এবং প্রমাণ ছাড়াই কিছু ভোটকেন্দ্র ‘প্রভাবিত’ হওয়ার অভিযোগ তোলেন।
পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির রোডম্যাপ, নতুন সমীকরণের কেন্দ্রে লেবানন


