বিজ্ঞাপন

৬টি হ্যান্ডলুম মেশিনে চলেছে রাজশাহী রেশম, ঐতিহ্য সিল্ক রক্ষায় সরকারী উদ্যোগ প্রয়োজন

বর্তমান পরিস্থিতি ও পুনর্জাগরণ বিগত কয়েক বছরে রাজশাহী রেশম তার পুরোনো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করেছে। রাজশাহীসহ দেশের মোট ৩২টি জেলায় রেশম নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে। বর্তমান রাজশাহীতে ৪০টি মেশিনের মধ্যে ৬টি মেশিন সচল রয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর কারখানা বন্ধ থাকার পর, ২০১৮ সালে সরকারি উদ্যোগে রাজশাহী রেশম কারখানাটি পরীক্ষা মূলকভাবে আবার চালু করা হয়, যা এই শিল্পের জন্য একটি মাইলফলক। দেশি ও বিদেশি গ্রাহক প্রায় রেশম শো-রুমে পরিদর্শন করছেন এবং পছন্দ মতো সিল্কের কাপড় ক্রয় করছেন।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী রেশম বোর্ডে রাজস্ব খাতে গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ২৯ কোটি ৯লক্ষ ১২ হাজার টাকা, ২৫-২৬ সালে ২৮ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে ৪০ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রধান রাজশাহী সিল্ককে বিশে^র দরবারে পূর্বের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কাজ করছেন।

রাজশাহীতে মূলত তিন ধরনের রেশম সুতা উৎপাদিত হয়, মালবেরি খাঁটি এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় রেশম। এন্ডি বা ইরি কিছুটা মোটা এবং শীতের কাপড়ের জন্য উপযোগী। তসর তামাটে রঙের এক বিশেষ ধরনের বুনন।
রাজশাহীর সিল্কের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও ওড়না দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বাঙালিদের কাছে সমান সমাদৃত এবং এটি রাজশাহীর অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। ২০২১ সালে “রাজশাহী রেশম” বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর স্বত্ব ও মান সুরক্ষিত হয়েছে।

রাজশাহী রেশম শুধু একটি কাপড় বা পণ্য নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অন্যান স্মারক। এর ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনি গৌরবময়। প্রাচীন ও ঔপনিবেশিক আমলে রেশমের সূচনা হয়, বাংলার রেশম চাষের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। তবে রাজশাহী অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এর বিকাশ ঘটে মূলত ওলন্দাজ (ডাচ) ও ব্রিটিশ আমলে। ভৌগোলিক সুবিধা হলো, পদ্মার অববাহিকায় অবস্থিত রাজশাহী অঞ্চলের আবহাওয়া এবং উর্বর মাটি তুঁত চাষের (যা রেশম পোকার প্রধান খাদ্য) জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ: সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ডাচ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলের রেশমের গুণগত মান দেখে মুগ্ধ হয়। তারা রাজশাহীর পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘা এলাকায় বেশ কিছু রেশম কুঠি স্থাপন করে। এই কুঠিগুলো থেকে কাঁচা রেশম ও সুতা প্রক্রিয়াজাত করে ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হতো। তৎকালীন সময়ে এটি “বেঙ্গল সিল্ক” নামে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজশাহীর রেশম শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রেশম কারখানা স্থাপন ১৯৫২ সালে সরকারি উদ্যোগে রাজশাহীর শিরোউইল এলাকায় “রাজশাহী রেশম কারখানা” স্থাপনের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬১ সালে এটি পুরোদমে উৎপাদন শুরু করে। গবেষণা ও উন্নয়নে রেশম চাষের আধুনিকায়ন ও পোকার জাত উন্নয়নের জন্য ১৯৬২ সালে রাজশাহীতে স্থাপন করা হয় “বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট”। স্বাধীনতার পর সোনালী অধ্যায় ও সংকট। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাজশাহীর রেশম শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান কুটির শিল্পে পরিণত হয়।

১৯৭৭ সালে রেশম শিল্পের সার্বিক তদারকি ও সম্প্রসারণের জন্য বোর্ড গঠিত হয় “বাংলাদেশ রেশম বোর্ড” যার সদর দপ্তর করা হয় রাজশাহীতে। বেসরকারি উদ্যোগে এই সময়ে সরকারি কারখানার পাশাপাশি উষা সিল্ক, সোপুরা সিল্ক, আমানা সিল্কের মতো বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকা সিল্কের হাবে পরিণত হয়। ক্রমাগত লোকসান, আধুনিকায়নের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী রেশম কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে এই শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খায়। তবে বেসরকারি সিল্ক মিলগুলো তাদের উৎপাদন ধরে রাখে।

রেশম বোর্ড অফিসের সূত্রমতে জানা যায়, রাজস্বে মোট জনবলের অনুমোদন রয়েছে ৫৮৩জন রয়েছে ২৫৬জন। একসময় বেনারশির বুননের মেশিন ছিল ৮টি, কাতানের ছিল ৪টিসহ হ্যান্ডলোম ও পাওয়ার লোম মেশিন বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমান যে মেশিন গুলো আছে সেগুলোর মধ্যে সিংহভাগ অচল হয়ে পড়ে আছে। এখন রেশম কারখানায় মাত্র ৬জন শ্রমিক কাজ করছে। এই স্বল্প জনবল দিয়ে সিল্ক টেকশয় করা সম্ভব নই।

সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফারুক আহম্মেদ বলেন, রেশম কিটের প্রধান খাবার হচ্ছে তুত গাছের পাতা। এই পাতার গুনগত মান কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সেই দিক লক্ষ্য রেখে গবেষনা চলমান রয়েছে। এছাড়া তুতগাছের রোগ বালায় এবং তুত গাছের আদ্রতার নিয়ে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।একটি তুত গাছের জাত নিয়ে গবেষণার জন্য কমপক্ষে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। বর্তমান ৩৮টি বিভিন্ন জাতের তুত গাছের জাত অবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছে রেশম গবেষনায়।

সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে রেশমের একমাত্র প্রতিষ্ঠান রাজশাহীতে। এখানে এই পর্যন্ত ১১৪টি রেশম কিটের জাত সংগ্রহ রয়েছে। এবং রেশম পুকা বা লুপের জন্য ৮৪টি তুত গাছের জাত চাষাবাদ হচ্ছে। এক সময় প্রতি হেক্টরে ২৫-৩০ কেজি রেশম গুটি উৎপাদন হতো এখন তা ৭০কেজিতে উর্ত্তীণ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৪৫-৪৭ মে.টন উৎপাদন হয় তবে পূর্বে ১২ মে.টন উৎপাদন হতো। সিল্ক একটি এসি পোডাক্ট এবং এই কাপড় স্বাস্থ্যসম্মত পোষাক।

বাংলাদেশে রেশম বোর্ড এর মহাপরিচালক তৌফিক আল মাহমুদ বলেন, বর্তমান এই সরকারের প্রধান মন্ত্রী রাজশাহী সিল্কের উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বর্তমান এই প্রতিষ্ঠানের জনবল সংকটে রয়েছে। খুব শিগ্রই জনবল চাহিদা পূরনে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। দেশের বৃহত্ত শিল্প রক্ষায় সরকার কাজ করছে।

পড়ুন- যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন