সাভার উপজেলা কনফারেন্স রুমে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের খেলা দেখছিলেন সাভারের দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি), কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁদের স্বজনরা। ওই দৃশ্যের ভিডিও ফুটেজ ধারণ এবং কনফারেন্স রুমে খেলা দেখা নিয়ে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিককে মারধর এবং তাঁর কাছ থেকে জোরপূর্বক মুচলেকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মারধরের শিকার ঢাকা টুডের সাংবাদিক মো. দিদারুল ইসলাম সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন।
দিদারুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, পেশাগত কারণে রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনকে ফোন দিই। তিনি আমাকে উপজেলায় যেতে বলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার ক্যামেরাম্যান মোজাহারকে নিয়ে উপজেলায় যাই। উপজেলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখি, সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন, আমিনবাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন, অন্যান্য স্টাফ ও কয়েকজন বহিরাগতকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে খেলা দেখছেন।
তিনি বলেন, ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনকে প্রশ্ন করি, সরকারি এসি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাতে খেলা দেখার আয়োজন কি আইনের পরিপন্থী নয়?
দিদারুলের অভিযোগ, এ প্রশ্ন করার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁর হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেন এবং অন্যরা তাঁর ক্যামেরাম্যানের কাছ থেকে ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে মেমোরি কার্ড খুলে নেয়। পরে সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের সামনে তাঁকে বেদম মারধর করা হয়। দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে মোবাইল কোর্টে দণ্ড দেওয়ার ভয় দেখিয়ে একটি মুচলেকা নেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।
বিষয়টি জানতে চাইলে সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হেমায়েতপুর এলাকায় অবস্থিত আল-আকসা নামের একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির স্টাফ উজ্জ্বল মিয়াকে আটক করে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাঁকে ২০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে তাঁকে ফোন দেন। পরে ওই কারখানার লোকজনকে নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। তিনি ধারণা করেছিলেন, তাঁরা জরিমানার টাকা নিয়ে আসামিকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছেন। তাই খেলা দেখা বাদ দিয়ে বাইরে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দাবি, সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম ওই কারখানার পক্ষে তদবির করে জরিমানা কমানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি জানান, জরিমানা হয়ে যাওয়ার পর আর কিছু করার সুযোগ নেই। এরপর সাংবাদিক বাইরে থেকে কনফারেন্স রুমে খেলা দেখার ভিডিও ধারণ করেন এবং কক্ষে প্রবেশ করে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে খেলা দেখার বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাঁকে শান্ত হতে বলি। কিন্তু তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি মদ্যপ অবস্থায় কথা বলছেন। তখন তাঁকে বলি, আপনি একটি অবৈধ কারখানার পক্ষে তদবির করতে এসেছেন। আপনাকে আটক করা হলো। পরে সাংবাদিকদের অনুরোধে তাঁর কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁকে মারধর করা হয়নি। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই তিনি মারধরের অভিযোগ তুলেছেন।’
সরকারি কনফারেন্স রুমে বিদ্যুৎ ও এসি ব্যবহার করে রাতে খেলা দেখার আয়োজন আইনের ব্যত্যয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলাই ভালো হবে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। পরে বিষয়টি শুনেছি। ওই সাংবাদিক মোবাইল কোর্টের জরিমানা কমানোর তদবিরে এসেছিলেন। কিন্তু মোবাইল কোর্টে জরিমানা কিংবা দণ্ড হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি বলার পর তিনি খেলা দেখার ভিডিও ধারণ করেন এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।’
ইউএনও বলেন, সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছেন। সেখানে মারধরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, ‘খেলা দেখার সময় ওই সাংবাদিকের সেখানে এসে এভাবে আচরণ করা উচিত হয়নি।’
সরকারি কনফারেন্স কক্ষে খেলা দেখার আয়োজন আইনের ব্যত্যয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, ‘দেশজুড়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনা চলছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ সবাই মিলে দেখলে আনন্দ হয়। ২০টি জায়গায় ২০টি টেলিভিশন চালানোর চেয়ে ২০ জন একসঙ্গে বসে খেলা দেখলে বরং বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। গতকাল বৈরী আবহাওয়া ছিল। এখানে এসি চালানো হয়নি। উপজেলার স্টাফ ও তাঁদের কয়েকজন পরিবারের সদস্য মিলে খেলা দেখছিলেন।’
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
ইউএনও একপর্যায়ে তাঁর কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখান। ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১১টা ১১ মিনিটে ক্যামেরাম্যান মোজাহারসহ তিনজনকে নিয়ে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম উপজেলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। অন্য তিনজনকে বাইরে রেখে তিনি একাই কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করেন। সেখানে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিহিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনের সঙ্গে মোবাইল টিপতে টিপতে কথা বলেন। এক মিনিট পর দুজন একসঙ্গে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে বাইরে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্বিতীয় তলাই কনফারেন্স রুমের একটু দূরে কথা বলেন। এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) একাই কনফারেন্স রুমে ফিরে গিয়ে খেলা দেখতে বসেন। কয়েক সেকেন্ড পর রাত ১১টা ১৬ মিনিটে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম আবার কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছাকাছি একটি চেয়ারে বসেন। রাত ১১টা ২৮ মিনিটে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান এবং রাত ১১টা ৩১ মিনিটে আবার ফিরে এসে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর পাশে বসেন। এরপর দুজন কথা বলতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর আর্জেন্টিনার জার্সি পরিহিত কয়েকজন তাঁদের ঘিরে দাঁড়ান। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জটলা বাড়তে থাকে। রাত ১২টা পর্যন্ত কক্ষে সেই দৃশ্য দেখা যায়।
এরপর রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন, সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম ও আরও কয়েকজনকে ভবনের নিচতলায় কথা বলতে দেখা যায়। রাত ১২টা ৪৩ মিনিটে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম সেখান থেকে চলে যান। তবে রাত ১২টা থেকে ১২টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত ৩৭ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ওই ফুটেজ মোবাইলে সংরক্ষিত আছে এবং তা দেখানো হবে।
সাংবাদিক দিদারুল ইসলামের কাছ থেকে নেওয়া মুচলেকায় লেখা রয়েছে, “আমি মোঃ দিদারুল ইসলাম মুভিবাংলা টেলিশিনের ঢাকা উত্তর এর সাংবাদিক হিসেবে করিত আছি। আমি এসিল্যান্ড ” সাভার এর নিকট অধৈ গ্যাস আল আকশা ফ্যাক্টরির আসামীপক্ষের পক্ষ হয়ে তদরীরে এসেছি এবং গোপনে কিছু ভিডিও ধারণ করি এবং আর কোনদিন এমন ভূল করিবনা যা আমি অন্যায় করেছি।”
দিদারুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সাইদুল ইসলাম বলেন, “দিদারুল ইসলাম নামে এক সাংবাদিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমি আজ হাসপাতালে নেই। দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তাঁর শরীরে তেমন কোনো আঘাত নেই। আমি আগামীকাল হাসপাতালে গিয়ে তাকে নিজে চোখে দেখে বিস্তারিত বললে ভালো হবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

