দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর ভরসা করে সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক চালচিত্র যদি চরম অমানবিকতা, দুর্নীতি আর আক্রোশের নগ্ন আখড়ায় পরিণত হয়, তবে সাধারণ কর্মচারীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। ইতিপূর্বে জনস্বার্থের নামে একজন আসন্ন অবসরপ্রাপ্ত ও মুমূর্ষু কর্মচারীকে এক বছরে ৫৭০ দিনে ৭ বার বদলির অমানবিক চিত্র তুলে এনেছিলাম।
কিন্তু এই ঘটনার গভীরে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে যে হাড়হিম করা তথ্য ও নথি বেরিয়ে এসেছে, তা কেবল বদলির খামখেয়ালিপনা নয়, বরং খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে জেঁকে বসা এক শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সুপরিকল্পিত ও চাঞ্চল্যকর নিপীড়নের জীবন্ত দলিল।
জীবন জুড়ে স্বাস্থ্য দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্য ঘড়ির কাটা যখন ১২ তে পৌছেছে ‘চলতি দায়িত্ব নিজ বেতনে” বেড়াজালে এ যেনো জ্যেষ্ঠতার অবমাননা, প্রতি মাসের হাজার খানেক টাকা যেনো কর্তপক্ষের গলার কাটা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই অমানবিক নিষ্ঠুরতার শিকার ব্যক্তিটি হলেন রাজশাহী স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা দিদার রসুল। গত ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলি বিষয়ক কমিটি তাঁকে স্টেনোগ্রাফার পদ থেকে দায়িত্ব ভাতাসহ ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ হিসেবে চলতি দায়িত্বে পদায়নের চূড়ান্ত সুপারিশ করে এবং একই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু এই যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও শান্তিতে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তাঁর ওপর প্রথম হয়রানিমূলক বদলির খড়্গ নেমে আসে। তৎকালীন আওয়ামীপন্থী ও স্বাচিপের প্রভাবশালী নেতা, রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. আনোয়ারুল কবির এই অন্যায়ের গোড়াপত্তন করেন। উল্লেখ্য, এই ডা. আনোয়ারুল কবিরের বিরুদ্ধে বর্তমানেও বহু দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে বহাল তবিয়তে কর্মরত আছেন, যা প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতিকেই স্পষ্ট করে।
অনুসন্ধান বলছে রাজশাহী পরিচালক স্বাস্থ্য -এর কার্যালয় যেনো বিধি লঙ্ঘন ও পরিচালকের সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও রেসট্রিকটেড জোন অব মাইম্যান এর এক গোলক ধাধা।
ডা. আনোয়ারুল কবিরের পর দফায় দফায় হয়রানিমূলক বদলি করা হলেও সবচেয়ে অমানবিক, বিধি-বহির্ভূত ও নজিরবিহীন জুলুমটি করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক বিতর্কিত পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবিএম আবু হানিফ। তিনি সরকারি निয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে, ‘বদলি কমিটি’র মতামত বা অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ একক ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে দিদার রসুলকে ‘চলতি দায়িত্ব’ থেকে টেনে নামিয়ে ‘স্ব-বেতনে’ বদলির আদেশ জারি করেন। শুধু তাই নয়, গত ৫৩০ দিনে যে ৭টি হয়রানিমূলক বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিটিই বদলি কমিটির কোনো সুপারিশ ছাড়াই পরিচালকদের একক খামখেয়ালিপনায় করা হয়েছে। খোদ অধিদপ্তর যেখানে নিজের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিধিবিধান ও শিষ্টাচারকে বুড়ো আঙুল দেখায়, সেখানে সাধারণ কর্মচারীদের নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ন কর্মক্ষেত্রের প্রত্যাশা যেনো পালটা খরগের অনুঘটক!
সিন্ডিকেটের পথে কাঁটা ? সাত মাসের বেতন বন্ধের নির্মমতায় প্রশ্ন জাগে, অবসরের মাত্র দুই মাস বাকি থাকা একজন মুমূর্ষু, হার্টের বাইপাস ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি করা রোগাক্রান্ত মানুষের পেছনে কেন এভাবে আঠার মতো লেগে আছে প্রশাসন ? ভেতরের খবর আরও চাঞ্চল্যকর। বর্তমান রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আবু সায়েম এবং বিতর্কিত অফিস সহকারী মো. সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত নিজস্ব বলয়টি ওই দপ্তরে নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের রাজ্য গড়ে তুলেছে। সৎ ও জ্যেষ্ঠ কর্মচারি দিদার রসুল তাঁদের এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের পথে প্রধান অন্তরায় বা ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মর্মে সিন্ডিকেট সর্বদা আশংকায়? নাকি চোরাগলি’’র নিষিদ্ধ পথে তার পদ টি দখল করা যার ফলশ্রুতিতে, তাঁকে ওই অফিস থেকে যেকোনো উপায়ে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে কুৎসিত কুটিলতার জাল বোনা হয় ? ক্ষমতার অপব্যবহার এখানেই থেমে থাকেনি, প্রায় ৭ মাসের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বন্ধ করে রেখেছেন বিভাগীয় পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান। একজন অসুস্থ মানুষকে বিনা বেতনে রেখে তিলে তিলে মারার এই অপকৌশল শুধু বেআইনিই নয়, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
অপরদিকে জিডির আসামিকে পদোন্নতির পুরস্কার যেনো চোরকে চাবির গোছা তুলে দেয়া।
এই সিন্ডিকেটের অনিয়ম ও স্বৈরশাসনের পরিধি কতখানি বিস্তৃত, তার প্রমাণ মেলে দপ্তরের অন্য দুই কর্মচারীর জালিয়াতির চিত্রে। মো. খুরশিদ উজ জামান ডিউক সম্পূর্ণ বিধি-বহির্ভূতভাবে ‘স্বাস্থ্য সহকারী’ পদ থেকে ‘উচ্চমান সহকারী’ এবং প্রাক্তন প্রধান সহকারী নাজমা বেগম একইভাবে ‘স্বাস্থ্য সহকারী’ থেকে ধাপে ধাপে ‘প্রধান সহকারী’ পদে পদোন্নতি হাতিয়ে নেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হিসাবরক্ষণ অফিসের উচ্চপর্যায়ের একাধিক পর্যবেক্ষনে এই দুইজনের পদোন্নতি সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিধি-বহির্ভূত প্রমাণিত হয় এবং তাঁদের মূল পদে ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।
কিন্তু নিয়তির কী নিষ্টুর কৌতুক মূল পদে ফেরত পাঠানো তো দূরের কথা, সম্প্রতি মো. খুরশিদ উজ জামান ডিউককে উল্টো ‘প্রধান সহকারী’ পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই পদায়ন পাওয়ার জন্য খুরশিদ উজ জামান ডিউক খোদ পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমানকে হুমকি দিয়েছিলেন এবং নিজের নিরাপত্তা ও প্রতিকারের স্বার্থে পরিচালক সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত করেছিলেন। যে অভিযুক্ত অপরাধী পরিচালককে হুমকি দেয় এবং যার বিরুদ্ধে জিডির তদন্ত চলছে, তাকেই আবার দপ্তরের প্রধান সহকারীর চাবির গোছা তুলে দেওয়া হয়েছে! এটি ভেঙে পড়া ও মেরুদণ্ডহীন ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক নগ্ন ও লজ্জাজনক বহিঃপ্রকাশ।
অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন, জনাব রসুলের ওপর হওয়া এই ধারাবাহিক নিপীড়ন প্রমাণ করে যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি অংশ এখন আর কোনো সরকারি বিধিমালা বা মানবিকতায় বিশ্বাস করে না। তারা কেবল নিজেদের আখের গোছাতে এবং সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত।
অবসরের প্রাক্কালে দিদার রসুলের এই বেআইনি বদলি আদেশ অনতিবিলম্বে বাতিল না করলে এবং তাঁর বকেয়া ৭ মাসের বেতন-ভাতা অবিলম্বে পরিশোধের ব্যবস্থা দ্রুততার সাথে না করলে স্বাস্থ্য সেক্টরের কর্মীরা মনোবল হারিয়ে ফেলবে, সরকারের স্বাস্থ্য বিষয়ক ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিঘ্ন ঘটবে। রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান, বিতর্কিত পিএ আবু সায়েম, অফিস সহকারী সাইফুল যিনি ক্যাশ সাইফুল নামে বহুল পরিচিত এবং খুরশিদ উজ জামান ডিউক সহ এই নিপীড়ক চক্রের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়ের দাবি। হুমকিদাতা ও অবৈধ পদোন্নতিধারী খুরশিদ উজ জামান ডিউকের মতো অপরাধীদের অবিলম্বে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। জনস্বার্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই মাফিয়াতন্ত্র ও ব্যক্তিগত আক্রোশের কালো হাত এখনই ভেঙে গুঁড়িয়ে না দিলে, সৎ কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাস আর অভিশাপে গোটা স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
পড়ুন : জঙ্গল থেকে গলাকাটা অবস্থায় হেঁটে আসা সেই ইরা মনি হত্যা মামলার রায় আজ
সা/


