রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে অভিনব কৌশলে যাত্রীবাহী প্রাইভেটকারে তুলে এক ব্যাংক ম্যানেজারকে জিম্মি ও নির্যাতন চালিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এই আন্তজেলা অপহরণ ও ছিনতাইকারী চক্রের মূল দুই সদস্যকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধমূলক এই কর্মকাণ্ডে সরাসরি ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে।
আজ রোববার (২৬ জুলাই) সকালে খিলক্ষেত থানায় আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন—মোঃ সুবেদ রানা (৩১) ও মোঃ মিরন ওরফে সুজন (৫৪)। সুবেদ রানার বাড়ি শরীয়তপুর জেলার সদর থানাধীন চর গাজীপুর এলাকায় এবং বর্তমানে তিনি মিরপুরের কাঠাল তলায় বসবাস করে আসছিলেন। অন্যদিকে মিরনের বাড়ি বরগুনা জেলার সদর থানার কালির তবক এলাকায়, বর্তমানে তিনি মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুরে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ রিকর্ড এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া উভয় ব্যক্তিই পেশাদার অপরাধী এবং ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক চুরি, ছিনতাই ও অপহরণের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ জানান, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর ব্যস্ততম মোড় ও মহাসড়কগুলোতে অবস্থান নিয়ে অভিনব উপায়ে সাধারণ যাত্রীদের টার্গেট করে আসছিল। সম্প্রতি তারা খিলক্ষেত এলাকা থেকে এক ব্যাংক ম্যানেজারকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে নিজেদের ভাড়া করা প্রাইভেটকারে তোলে। এরপর গাড়ি চালু করতেই চলন্ত গাড়ির ভেতর ভুক্তভোগীর হাত-পা বেঁধে তাঁর ওপর বেধড়ক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তীতে তাঁকে জিম্মি রেখে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ হাতিয়ে নেওয়া হয় এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে ৩০০ ফিট রাস্তার পাশে একটি নির্জন স্থানে ফেলে রেখে আসামিরা পালিয়ে যায়।

যেভাবে ঘটেছিল অপহরণ ও নির্যাতন
মামলার এজাহার, খিলক্ষেত থানা-পুলিশ ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি সূত্র জানা যায়, গত ২১ জুন সকাল অনুমান ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে খিলক্ষেত থানাধীন কুড়িল বিশ্বরোডস্থ বিআরটিসি কাউন্টারের সামনে নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজগামী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন ভুক্তভোগী ব্যাংকার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। এ সময় একটি প্রাইভেটকার এসে থামে এবং এর চালক অত্যন্ত কৌশলে ও সদয় ভঙ্গিতে কাঞ্চন ব্রিজ যাওয়ার কথা বলে মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে গাড়ির পেছনের সিটে তুলে নেয়।
প্রাইভেটকারটি চলা শুরু করার পরপরই পেছনের সিটে আগে থেকে ওঁৎ পেতে বসে থাকা চক্রের দুই সদস্য অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কামরুজ্জামানের দুই হাত পেছনের দিকে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। এরপর তারা তাঁর কাছে থাকা নগদ ৫ হাজার টাকা এবং ব্যবহৃত একটি ভিভো ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেয়।
সেখানেই ক্ষান্ত না হয়ে অপহরণকারীরা তাঁকে মারাত্মকভাবে মারধর শুরু করে এবং তাঁর পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লাখ টাকা দাবি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। টাকা না দিলে তাঁকে মেরে লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এ অবস্থায় আতঙ্কিত ব্যাংকারকে প্রাইভেটকারে আটকে রেখে ৩০০ ফিট এলাকাসহ পূর্বাচল ও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন নির্জন সড়কে বেশ কিছু সময় ধরে ঘুরিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়।
অবশেষে প্রাণ বাঁচাতে এবং শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কামরুজ্জামান জিম্মি থাকা অবস্থাতেই কৌশল অবলম্বন করে তাঁর কর্মস্থলের সহকর্মী মো: রবিউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আসামীদের চাহিদা ও নির্দেশনা অনুযায়ী সহকর্মী রবিউল ইসলাম নগদ ৫ লাখ টাকা নিয়ে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছান। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল সংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজের নিচে গিয়ে তিনি অবস্থানরত আসামি সুবেদ রানার হাতে টাকাগুলো বুঝিয়ে দেন। মুক্তিপণের টাকা হাতে পাওয়ার পরপরই বেলা ১১টা ১৪ মিনিটের দিকে অপহরণকারীরা ব্যাংকার কামরুজ্জামানকে ৩০০ ফিট রোডস্থ নীলা মার্কেট গোলচত্বরের পাশে রাস্তার ধারে ফেলে দিয়ে দ্রত প্রাইভেটকার চালিয়ে স্থান ত্যাগ করে।
যেভাবে পুলিশের জালে ধরা পড়ল অপরাধীরা
জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ শেষে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে খিলক্ষেত থানায় পেনাল কোডের ৩৯৪ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-২১, তারিখ: ২২/০৬/২০২৬) রজু করা হয়।
মামলা দায়েরের পরপরই ডিএমপি কমিশনারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদের নির্দেশনায় খিলক্ষেত থানার একটি চৌকস অভিযানিক দল মাঠে নামে। পুলিশ সদস্যরা আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মূল আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করেন। প্রথম দফায় খিলক্ষেত থানা-পুলিশ রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একটি ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত মূল হোতা আসামি সুবেদ রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
পরে গ্রেপ্তারকৃত সুবেদ রানাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ জুলাই মধ্যরাতে (রাত ১২টা ৩০ মিনিটে) মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন মুক্তারপুর এলাকায় দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে যৌথ দল অভিযান চালিয়ে মূল সহযোগী মোঃ মিরন ওরফে সুজনকে গ্রেপ্তার করে।
পরবর্তীকালে গ্রেপ্তারকৃত এই দুই আসামির দেওয়া চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ঢাকা মহানগরীর মিরপুর মডেল থানাধীন মনিপুর এলাকায় অভিযান চালায়। সেখানে লুকিয়ে রাখা অপহরণ কাজে সরাসরি ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি চিহ্নিত করে জব্দ করা সম্ভব হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তা এম তানভীর আহমেদ সতর্ক বার্তা দিয়ে বলেন, এই ধরনের পেশাদার চক্রগুলো সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে প্রাইভেটকারে যাত্রী তোলে এবং পরবর্তীকালে ভয়ংকর অপরাধ সংঘটিত করে। এই আন্তজেলা সংঘবদ্ধ চক্রটির অন্য কোনো সহযোগী প্রকাশ্যে বা গোপনে সক্রিয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের তল্লাশি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে খিলক্ষেত থানা-পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
পড়ুন : ধানমন্ডিতে পরিত্যক্ত সুধা সদন থেকে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার


