“পানি লাগবে পানি!”- জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই আহ্বান আজও বাজে উত্তরার বাতাসে। শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ জুলাইয়ের সব যোদ্ধার স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে আছে উত্তরা ও সারাদেশের ছাত্র-জনতার হৃদয়ে।
আজ ৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সারাদেশের মতো উত্তরায়ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শহীদদের স্মরণ করা হয়। দিনটি উপলক্ষে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সাথে দেখা করে তাদের খোঁজখবর নেন।
শহীদদের স্মরণে কাজ করা শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে উত্তরা এলাকায় গণঅভ্যুত্থানে সব মিলিয়ে ৯২ জন শহীদ হয়েছেন।
এর মধ্যে শিক্ষার্থী ২৫ জন, চাকরিজীবী ১৯ জন, ব্যবসায়ী ১০ জন, গাড়ি বা রিকশাচালক ৫ জন, মসজিদের ইমাম ২ জন, চিকিৎসক ১ জন এবং অন্যান্য পেশার ও অজ্ঞাত ২৬ জন। এর মধ্যে ১ জনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান।
উত্তরার বিএনএস সেন্টার, মাইলস্টোন কলেজ এলাকা, ৩ ও ১ নম্বর সেক্টরসহ সংলগ্ন মহাসড়কে ১৮-১৯ জুলাই এবং ৫ আগস্ট সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিমানবন্দর মহাসড়কে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ডেকে ডেকে পানি খাওয়ানো শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের স্মরণে উত্তরায় নির্মিত হয়েছে ‘মুগ্ধ মঞ্চ’। এটি উত্তরা আজমপুর ৩/৭ নং সেক্টর, রবীন্দ্র স্মরণী রোড, তিন রাস্তার মোড়, লাবাম্বার সামনে লেকপাড়ের উন্মুক্ত স্থানে অবস্থিত।
গত ১৮ জুলাই ২০২৪ রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছেলে মুগ্ধ। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও তাকে দেখা যায় পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে চোখ জ্বলতে জ্বলতে শিক্ষার্থীদের হাতে পানির বোতল তুলে দিতে। ১৫ মিনিটের মাথায় সড়কে বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি বুলেট তার কপালে এসে লাগে। মুগ্ধের সেই “পানি লাগবে পানি” ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
মুগ্ধ নিহত হওয়ার ঠিক দুইদিন আগে ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। এই দুই মৃত্যু সারাদেশে কোটি মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে। এর ফলেই বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মূলধারার গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
মুগ্ধ, জোবায়ের, আবু সাঈদ, আসিফ, রাফি, ওয়াসিম, আদনান, ফারুকসহ যারা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের স্মরণে উত্তরার দেয়ালে দেয়ালে এখন আল্পনা ও গ্রাফিতি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাস্তার দেয়ালে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের চিত্র এঁকেছেন ছাত্র-জনতা। শিক্ষার্থীদের হরেক রকম স্লোগান ও দেয়াল লিখনিতে রঙিন হয়ে উঠেছে পুরো উত্তরা।
পুরো জুলাই মাসজুড়ে “তুলিতে জুলাই, গ্রাফিতিতে জুলাই” স্মৃতিতে জুলাই নামে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুরা তাদের রংতুলিতে তুলে ধরেছে জুলাই যোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প।
গণিতে স্নাতক মুগ্ধ এমবিএ করছিলেন। তার ছোট ভাই স্নিগ্ধ আইনে স্নাতক। খাওয়া-ঘুম-পড়াশোনা থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত ভাগাভাগি করা যমজ দুই ভাই ছিলেন অবিচ্ছেদ্য। তারা অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইভারের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্কেটিং করতেন। শহীদ হওয়ার সময় মুগ্ধের গলায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড, হাতে ছিল পানির বোতল। জুলাই শহীদদের স্মৃতিচারণে আলোচনা, মিলাদ দোয়া ও তরারুক বিতরণসহ নানান আয়োজনে পালিত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস।
৫ আগস্ট ২০২৪ ইং তারিখ শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর এখন শহীদ পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনের মৃত্যুর জবাবদিহি চাইছেন।
আজও উত্তরার লেকপাড়ে দাঁড়ালে কানে ভাসে সেই আওয়াজ- “পানি লাগবে পানি”।
পড়ুন : জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একার অর্জন নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী


