ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চর মজলিসপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর কুঠিরহাট (মাস্টারপাড়া) এলাকায় মসজিদ ও কবরস্থানের জমির ওপর দিয়ে চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ‘হিন্দু সম্পত্তি দখল করে মসজিদ নির্মাণের’ অভিযোগ ওঠায় এলাকায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগটি ভিত্তিহীন। ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাজী মাস্টার আবু বকর সিদ্দিক দীর্ঘদিন আগে তাঁর মালিকানাধীন জমির একটি অংশ মসজিদের জন্য দান করেন। ওই জমিতে বর্তমানে জামে মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মসজিদ ও কবরস্থানের আশপাশে বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সিদ্দিক মাস্টারের পরিবারের জমির ওপর দিয়ে চলাচল করে আসছেন।
সম্প্রতি মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থানের সীমানাপ্রাচীর ও গেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্দিক মাস্টারের ছেলে সিদ্দিক আল মামুনের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু সম্পত্তি দখল করে মসজিদ নির্মাণের’ অভিযোগ তোলা হয়। তবে অভিযোগে যাঁদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন দাবি করেছেন, তাঁরা এ ধরনের কোনো অভিযোগ করেননি এবং তাঁদের বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে আলোচনা হয়। এ সময় মসজিদ পরিচালনা কমিটি, বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগটিকে ভিত্তিহীন দাবি করে প্রকৃত ঘটনা তদন্তের আহ্বান জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা বিবি রহিমা বলেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে অভিযোগ করা হলেও তিনি কোনো অভিযোগ করেননি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সিদ্দিক আল মামুনদের জমির ওপর দিয়ে চলাচল করছেন এবং এ নিয়ে কখনো তাঁদের বাধা দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা নুর ফরিদ সোহেল ও আরিফ মিয়াজীর অভিযোগ, মোজাম্মেল হোসেন ও মো. ইব্রাহিম সিদ্দিক মাস্টারের জমির পেছনের অংশে জমি কিনে বসতবাড়ি নির্মাণ করেছেন। তাঁদের দাবি, জমি কেনার সময় নিজস্ব চলাচলের পথের ব্যবস্থা না করেই পরবর্তীতে চলাচলের জন্য জায়গা দাবি করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রচারণার মাধ্যমে সিদ্দিক আল মামুন ও তাঁর পরিবারের সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, মসজিদের জন্য জমি দানের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের জানা। বর্তমানে মসজিদ কমিটির তত্ত্বাবধানে সেখানে মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, বিষয়টিকে ‘হিন্দু সম্পত্তি দখল’ হিসেবে প্রচার করে স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
বিষ্ণুপুর সমাজের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম বলেন, কুঠিরহাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সিদ্দিক মাস্টারের পরিবারের জমির ওপর দিয়ে মানুষের চলাচল রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্দিক মাস্টারের দান করা জমিতেই মসজিদ ও কবরস্থান নির্মিত হয়েছে। চলাচলের সুবিধা নিয়ে বিরোধের জেরে বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চর মজলিসপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, হিন্দু সম্পত্তি দখল নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো সত্য নয় বলে তিনি মনে করেন। ব্যক্তিস্বার্থে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়—এমন প্রচারণা চালানো উচিত নয়। তাঁর দাবি, জমি কেনার সময় চলাচলের পথ নিশ্চিত করা ক্রেতার দায়িত্ব। একই সঙ্গে তিনি বলেন, চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও সঠিক নয়; অভিযোগকারীরা এখনো ওই পথ দিয়ে চলাচল করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সিদ্দিক আল মামুন বলেন, তাঁদের জমি দিয়ে কাউকে চলাচলে কখনো বাধা দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। তাঁর দাবি, পেছনের জমি কেনার আগে চলাচলের পথ নির্ধারণ করা ক্রেতার দায়িত্ব। বর্তমানে পেছনের বসতবাড়ির লোকজন তাঁদের জমির ওপর দিয়ে একাধিক স্থান ব্যবহার করে চলাচল করছেন। সবাই যদি একটি নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে চলাচল করেন, তাহলে এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী চলাচলের পথ তৈরিতে তিনি ও তাঁর পরিবার উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে পেছনের সব জমির মালিকের জন্য উপযুক্ত চলাচলের পথ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জমি ও চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধের সুষ্ঠু সমাধানের পাশাপাশি কোনো পক্ষের বক্তব্য যাচাই না করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে—এমন প্রচারণা থেকে সবাই বিরত থাকবেন।
পড়ুন:সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার পাবে ৫ লাখ
ইমি/


