নওগাঁর আত্রাইয়ে চলাচলের রাস্তা না পেয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এমনকি সুরক্ষার জন্য দেওয়া দীর্ঘ দিনের প্রাচীর ভেঙে দেওয়ারও অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। আর রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে পাল্টাপাল্টি মামলা, বসতবাড়ির প্রাচীর ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে দুই পক্ষের বিরুদ্ধে।
এক পক্ষের দাবি, চলাচলের রাস্তা থাকার পরও সুবিধামতো রাস্তা না পেয়ে প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। অন্য পক্ষের অভিযোগ, তাদের জমির ওপর জোর করে প্রাচীর নির্মাণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলা, মারধর ও চুরির ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী মুক্তাদির রহমান মামুনের পরিবারের নিরাপত্তার দাবিতে রোববার সকালে উপজেলার ধুলাউড়ি গ্রামে ঘটনাস্থলের সামনে মানববন্ধনও করে স্থানীয়রা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্রায় শতাধিক এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের বিরোধ চলে আসছে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি। এরই মধ্যে মুক্তাদির রহমানের দেওয়া দীর্ঘ দিনের প্রাচীর ভাঙচুর ও পুনরায় নির্মাণকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে।
মুক্তাদির রহমানসহ স্থানীয়দের দাবি প্রতিপক্ষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করা হয়নি। তাদের চলাচলের জন্য রাস্তা থাকার পরও শুধুমাত্র হয়রানি ও গন্ডগোল করার জন্য এসব করছে। সেখানে চলাচলের যে রাস্তা আছে ওই রাস্তা দিয়ে অনেকেই যাতায়াত করে থাকে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তারপরও গত ৩আগস্ট দুপুরে জাহাঙ্গীর আলম ও আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের বসতবাড়িতে প্রবেশ করে। এবং তাদেরই জমিতে ইটের তৈরি সীমানাপ্রাচীর ও স্টোররুম ভাঙচুর করেন। এতে প্রায় ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, এ সময় তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে মেহেরুন আক্তার স্মৃতি ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাকে ধারালো হাসুয়া দিয়ে কোপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে দ্রুত সরে যাওয়ায় সে রক্ষা পায়। পরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের লাশ গুম করার হুমকি দিয়ে চলে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় গত ৪আগস্ট মুক্তাদির রহমান বাদী হয়ে আত্রাই থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে লিখিত এজাহার দেন।
অন্যদিকে, মুক্তাদির রহমান তার ভেঙে দেওয়া প্রাচীর গত ৬আগস্ট পুনরায় নির্মাণের সময় প্রতিপক্ষ জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মোছা. খুরশেদা বিবি বাধা দিতে গেলে তাকে কয়েকজন নারী টেনেহিঁচড়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেন বলে জানা গেছে। আর এঘটনার পর ৭আগস্ট খুরশেদা বিবি বাদী হয়ে মুক্তাদির রহমান মামুনসহ ১৪ জন নারী-পুরুষের বিরুদ্ধে মারপিট, শ্লীলতাহানি ও চুরির অভিযোগে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে খুরশেদা বিবি অভিযোগ করেন, জমি ও যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে আসামিরা ৬আগস্ট রাস্তা বন্ধ করে প্রাচীর নির্মাণ করছিলেন। তিনি ও তার মেয়ে আন্নিকা অথই এতে বাধা দিলে তাদের মারধর করা হয় এবং পরনের কাপড় ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করা হয়। পরে বাড়িতে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং ড্রয়ার ভেঙে আট ভরি স্বর্ণ, নগদ দুই লাখ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মুক্তাদির রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে আমাদের বাড়িতে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। আমার মেয়েকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পরে আমাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও চুরির মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। বহিরাগতদের দিয়েও নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মামলা ও প্রাণনাশের আশঙ্কায় আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার চাই।
স্থানীয় ভ্যানচালক সেলিম হোসেন বলেন, খুরশেদা বিবি যে নারী নির্যাতন ও চুরির মামলা করেছেন, সেটি বানোয়াট। ঘটনার দিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই মামলাটি করা হয়েছে।
স্থানীয় ছামছুর রহমান মৃধা, মুকুল হোসেনসহ আরও কয়েকজনও মামলাটিকে ভিত্তিহীন দাবি করে মুক্তাদির রহমানের পরিবারের পাশে থাকার কথা জানান। তাদের দাবি, মামুনের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
এদিকে মানববন্ধন শেষে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিপক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোয় প্রতিপক্ষের কয়েকজন ক্ষুব্ধ হয়ে সেখানে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। এমনকি মানববন্ধন শেষে ফেরার সময় সংবাদকর্মীদের সামনেও তারা হুমকিমূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, চলাচলের রাস্তা না দিয়ে তারা আমাদের জমির ওপর প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। সেটি ভেঙে দেওয়ার পর আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে আমরা জামিন নিতে গেলে তারা আবারও প্রাচীর নির্মাণ করে। আমার স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাকে মারধর করে টাকা নিয়ে যায়।
একই বিষয়ে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে থাকা আমজাদ হোসেন বলেন, তারা সালিশ-বৈঠকের সিদ্ধান্ত না মেনে জোর করে প্রাচীর নির্মাণ করছিল। এ কারণে একবার প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পরে আবারও জোর করে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। তখন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাকে মারধর করে বাড়িতে ঢুকে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আমজাদ হোসেন জানান, সে সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। একই সঙ্গে মানববন্ধনে বহিরাগতদের এসে প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুক্তাদির রহমানের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ধুলাউড়ি গ্রামের বাসিন্দা মুক্তাদির রহমানের পরিবারের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী খুরশেদা বিবির পারিবারিক ও জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও বিরোধের সমাধান হয়নি।
অন্যদিকে খুরশেদা বিবির মামলার এজাহারে জমি ও যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুই পক্ষই তাদের নিজ নিজ অভিযোগের পক্ষে আইনি প্রতিকার চেয়েছে।
আবার মুক্তাদির রহমানের ভাই লন্ডনপ্রবাসী ড. মিজানুর রহমান তাদের পরিবারের নিরাপত্তা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের হস্তক্ষেপে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করছেন।
এ বিষয়ে আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, উভয় পক্ষেরই মামলা রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো ধরনের মারামারি বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য উভয় পক্ষকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
পড়ুন:জুয়া খেলায় নিষেধ করায় কলেজ শিক্ষককে কুপিয়ে জখম, হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন
ইমি/


