নেত্রকোনার সীমান্ত ঘেঁষা কলমাকান্দা উপজেলায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ দখল করে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে চলছে অবৈধ বালু মজুত ও জমজমাট ব্যবসা। উপজেলার কৈলাটি ইউনিয়নের শ্যামপুর এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘হিলফুল ফুজুল দাখিল মাদ্রাসা’র খেলার মাঠটি এখন বালু ব্যবসায়ীদের উন্মুক্ত গুদামে পরিণত হয়েছে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ ও খেলাধুলা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বালুর বিষাক্ত ধুলায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় শক্তিশালী প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির মাঠটি জবরদখল করে এই কারবার পরিচালনা করছে। দফায় দফায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে আজও মেলেনি কোনো প্রতিকার। ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং জনমনে প্রশ্ন উঠেছে- এই বালু সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর আসলে কোথায়?
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার বহুতল ভবনের ঠিক সামনের খেলার মাঠজুড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে সাদা ও লালচে বালুর বিশাল বিশাল ঢিবি। সংলগ্ন নদীর ঘাট থেকে বালু এনে সরাসরি মাঠটিতে খালাস করা হচ্ছে। সেখানে প্রতিনিয়ত চলছে ভারী যানবাহনের আনাগোনা ও বালু ওঠানামার কাজ।
একাধিক স্থানীয় সূত্রের দাবি, কলমাকান্দার মহাদেও নদ ও ধেনকি নদী থেকে ড্রেজার ও দেশীয় পদ্ধতিতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বড় বড় নৌকাযোগে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া সীমান্তবর্তী লেংগুরা ইউনিয়নের গণেশ্বরী নদী থেকে উত্তোলিত বালু বিভিন্ন নদী ও সড়কপথে উপজেলার ডেট্টাখালী ঘাট, কৈলাটি ইউনিয়নের পাগলা, শ্যামপুর ও তেঘরিয়া এলাকায় জড়ো করা হয়। এরপর শ্যামপুরের এই মাদ্রাসা মাঠসহ আশপাশের পয়েন্টগুলোতে বালু মজুত করে দিন-রাত ড্রামট্রাক, লরি ও মাহিন্দ্রযোগে নেত্রকোনা জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্চমূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, সাদেক, আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক, এরশাদ ও সৈকতসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সরাসরি এই বালু বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। প্রভাবশালী এই চক্রটির বিরুদ্ধে ভয়ে সাধারণ মানুষ সরাসরি মুখ খুলতে সাহস পায় না। অভিযোগ রয়েছে, ভারী ড্রামট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামীণ রাস্তাঘাট ধ্বংস হচ্ছে এবং ধুলাবালিতে আশপাশের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থী জাকিয়া আক্তার ও রাহুলসহ একাধিক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, “আমাদের একমাত্র খেলার মাঠটি বালু ফেলে দখল করে রাখা হয়েছে। টিফিনের সময় বা ছুটির পর আমরা কোনো খেলাধুলা করতে পারি না। একটু বাতাস দিলেই মাঠের শুকনো বালু ও ধুলা উড়ে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। এতে চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া করে এবং শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়। অনেকের চোখেই ইতোমধ্যে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।”
মাদ্রাসার সুপার আব্দুল লতিফ বলেন, “প্রায় দুই বছর ধরে মাদ্রাসার মাঠটি দখল করে বালুর ব্যবসা চালানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় আমরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
তিনি ক্ষোভের সাথে আরও যোগ করেন, “শ্যামপুর বাজারে এসে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ফিরে যান- এমন জোরালো আলোচনা ও অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
এ বিষয়ে সিধলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে কলমাকান্দা উপজেলার নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন. এম. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ দখল করে কোনো প্রকার বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদী ও নদী অববাহিকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সাজা ও জরিমানা অব্যাহত রেখেছে।”
স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ দখল করে বালু বাণিজ্য একদিকে শিক্ষার পরিবেশকে গলাটিপে ধরছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও বিপথগামিতা থেকে দূরে রাখার একমাত্র মাধ্যম খেলাধুলা থেকেও বঞ্চিত করছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে এই অবৈধ বালুর আড়ত উচ্ছেদ করে মাঠটি দখলমুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
পড়ুন : নোয়াখালীতে দপ্তরির বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের জমি দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ


