নারায়ণগঞ্জ সিটি পার্কসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মতো দেখতে বন্দুক হাতে দুই যুবকের ঘোরাঘুরি এবং পথচারীদের দিকে বন্দুক তাক করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ৩৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে শিশু, রিকশাচালকসহ সাধারণ মানুষের দিকে অস্ত্র তাক করতে দেখা যায় দুই যুবককে।
গত ২০ আগস্ট ‘ওয়াফি লিমন’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি আপলোড করা হয়। পরে এটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ভিডিওতে কালো রঙের লম্বা কুর্তা-পায়জামা ও মাথায় টুপি পরা দুই তরুণকে দেখা যায়। তাঁদের হাতে থাকা বড় দুটি বন্দুক দেখতে অনেকটা আসল অস্ত্রের মতো। কখনো পার্কের ভেতরে, কখনো ব্যস্ত সড়কে আবার কখনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পথচারীদের দিকে হঠাৎ বন্দুক তাক করতে দেখা যায় তাঁদের। একটি দৃশ্যে চলন্ত পথে থাকা এক শিশুকেও বন্দুক দেখে চমকে উঠতে দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ঘটনাটিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তবে ভিডিওটির নির্মাতা নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বাসিন্দা লিমন তোহা একটি গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, এটি বাস্তব অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা নয়। ভিডিওতে ব্যবহৃত দুটি বন্দুকই খেলনা। মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ধারণ করতেই পরিকল্পিতভাবে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
লিমন তোহার সঙ্গে বন্দুক হাতে থাকা অপর তরুণের নাম ইয়াসিন। ভিডিও ধারণে ইয়াসিন তাঁকে সহযোগিতা করেন বলে জানান লিমন।
লিমন বলেন, “এটি মূলত ফানি ভিডিও হিসেবে বানানো। আমরা মানুষের ভয় পাওয়ার অংশটুকু প্রকাশ করেছি। পরে তাঁরা যে মজা করেছেন, সেই অংশটি প্রকাশ করিনি। এ কারণে অনেকে ভিডিওটি নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছেন।”
তিনি জানান, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও নাটকের দৃশ্য এবং টিকটকের বিভিন্ন ট্রেন্ড দেখে এ ধরনের ভিডিও তৈরিতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। প্রথমে টিকটকের ‘ভাইবোন’ অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। পরে ‘লিমন সিন্স ২০০৪’ নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এবং ‘ওয়াফি লিমন’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। তিনটি অ্যাকাউন্টই তাঁর বলে জানান তিনি।
প্রকাশ্যে অস্ত্রের মতো দেখতে বন্দুক হাতে ঘুরে মানুষকে ভয় দেখানো অপরাধ কি না জানতে চাইলে লিমন বলেন, বিষয়টি অপরাধ কি না তিনি জানেন না। তাঁর দাবি, ভিডিও ধারণের সময় পুলিশের সদস্যরাও বিষয়টি দেখেছিলেন। প্রথমে তাঁরা কিছুটা অবাক হলেও পরে বন্দুকগুলো খেলনা বুঝতে পারেন। পুলিশের প্রতিক্রিয়াও ধারণ করা হয়েছিল, তবে ভালোভাবে ধারণ না হওয়ায় তা প্রকাশ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী শুক্রবার বিকেলে বলেন, “এরকম কোনো ভিডিও এখন পর্যন্ত আমাদের চোখে পড়েনি। তবে কেউ যদি এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে থাকে, আমরা সবার আগে দেখব অস্ত্রগুলো বৈধ বা লাইসেন্স করা কি না। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অস্ত্রগুলো লাইসেন্সকৃত বা বৈধ না হলে, অথবা খেলনা হলেও ভিডিও দেখে তাদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি পুলিশ অবগত হয়েছে এবং ভিডিওটি তারা পেয়েছে।
তিনি বলেন, “যে পার্কে এই অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয়েছে, সেই পার্কের ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের ফোর্স পাঠানো হয়েছে। ম্যানেজারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ওই দুই যুবককে চিহ্নিত করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানানো হলেও, ভিডিওতে ব্যবহৃত অস্ত্র দুটি প্রকৃতপক্ষে খেলনা নাকি অন্য কোনো ধরনের অস্ত্র—তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খেলনা বন্দুক দিয়ে তৈরি করা ‘ফানি ভিডিও’ বলে নির্মাতার দাবি থাকলেও প্রকাশ্য স্থানে শিশু ও সাধারণ মানুষের দিকে অস্ত্রের মতো দেখতে বন্দুক তাক করে ভয় দেখানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিনোদনের নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং এমন কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও চলছে আলোচনা।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

