ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও সততা থাকলে শূন্য থেকেও সফলতার শিখরে পৌঁছানো সম্ভব—ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার এওয়াজপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সন্তান আব্দুর রহমান হাজারী যেন তারই উদাহরণ। পারিবারিক অসচ্ছলতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই মানুষটি আজ সফল উদ্যোক্তার পাশাপাশি এলাকার শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও রেখেছেন ভূমিকা।
আব্দুর রহমানের কর্মজীবনের শুরুটা ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করার পর পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাকে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়। এরপর ‘ঢাকা কুইন বেকারি’তে ম্যানেজার পদে যোগ দেন। সেখানে টানা আট বছর সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে ব্যবসার নানা দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
পরে বাবা-মায়ের অসুস্থতার কারণে ঢাকার কর্মজীবন ছেড়ে জন্মস্থান চরফ্যাশনে ফিরে আসেন আব্দুর রহমান। তবে থেমে থাকেননি। ঢাকায় অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চরফ্যাশন ন্যাশনাল ব্যাংকের নিচে ‘ঢাকা কুইন বেকারি এন্ড কনফেকশনারি’ নামে একটি ছোট দোকানের মাধ্যমে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। মানসম্মত পণ্য ও গ্রাহকসেবার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসাটি সফলতা পায়।
এরপর ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চরফ্যাশন থানা রোডের মাথায় তুলনামূলক বড় পরিসরে গড়ে তোলেন ‘ঢাকা বেকারি এন্ড কনফেকশনারি’। দুটি শোরুমে শুরুতেই কর্মসংস্থান হয় প্রায় ১৫ জনের।
ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাঁচ বছর পর নিজস্ব উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেন আব্দুর রহমান। চরফ্যাশন টিভি স্কুলের পাশে স্থাপন করেন বিস্কুট, রুটি ও বিভিন্ন বেকারি পণ্য তৈরির কারখানা। সেখানেও সাফল্য পাওয়ার পর নিজের পৈতৃক জমিতে গড়ে তোলেন আধুনিক ও বড় পরিসরের ‘ঢাকা কুইন ব্রেড এন্ড ফ্যাক্টরি’।
বর্তমানে তার তিনটি প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ২১৫ জন কর্মচারী কাজ করছেন। এর মধ্যে শুধু বড় কারখানাটিতেই কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০০ জন শ্রমিকের। তার উৎপাদিত বেকারি পণ্য ভোলা জেলার পাশাপাশি অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে বর্তমানে তার বাৎসরিক আয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন আব্দুর রহমান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের আয়ের ৮০ শতাংশ ব্যবসার মানোন্নয়ন ও পারিবারিক কাজে ব্যয় করেন এবং বাকি ২০ শতাংশ এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন। ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অসহায় মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহন, দরিদ্র পরিবারের কন্যার বিয়ে ও অন্যান্য আয়োজনে আর্থিক সহায়তা এবং চলাচলের অনুপযোগী গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংস্কারে অর্থ ব্যয় করেন তিনি।
কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ভাষ্য, আব্দুর রহমান তাদের সঙ্গে মালিক-কর্মচারীর মতো নয়, বরং পরিবারের সদস্যদের মতো আচরণ করেন। তাদের মতে, তিনি অমায়িক ব্যবহার করেন এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধের পাশাপাশি বিপদ-আপদ বা পারিবারিক প্রয়োজনে অগ্রিম অর্থের প্রয়োজন হলেও সহযোগিতা করেন। শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও সন্তুষ্ট বলে জানান তারা।
এলাকাবাসীর মতে, আব্দুর রহমান শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, এওয়াজপুর ইউনিয়নের জন্যও তিনি গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। গরিব-দুঃখী ও মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তার প্রতি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শুরুতে এ প্রস্তাবে রাজি না থাকলেও পরে এলাকাবাসী ও অবহেলিত মানুষের অনুরোধে তিনি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছেন।
এব্যাপারে কুইন বেকারি এন্ড কনফেকশনারি মালিক উদোক্তা আবদুর রহমান হাজারী নাগরিক টিভিকে জানান,
“আমি মধ্যবর্তী পরিবারের সন্তান,এইচএসসি পাশ করে আর্থিক সংকটের কারণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে ঢাকা কুইন বেকারিতে ম্যানেজার পদে ৮ বছর চাকরি শেষে চরফ্যাশন চলে আসি।পর্যাক্রমে তিনটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি।আলহামদুলিল্লাহ, তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে বার্ষিক ৬০ লাখ টাকার মত আয় হচ্ছে। আয়ের ৮০%নিজের কাজে ব্যয়, ২০%মানব কল্যাণে ব্যয় করেছি।তিনি আরও বলেন, আমার জন্মস্থান এওয়াজপুরের মানুষের সুখে ও দুঃখে পাশে দাঁড়ানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।রাস্তাঘাট মেরামত, নির্মাণ ও রোগীর সেবায় সাধ্য মতে ব্যয় করে যাচ্ছি।
আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত।
আসন্ন নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে অগ্রহী। স্হানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন ভাই দলীয় ভাবে, আমাকে মনোনয়ন দিলে, আমি নির্বাচিত হতে পারলে এলাকার জনগণের কল্যাণে নিজকে আত্মনিয়োগ করবো ইনশাআল্লাহ।”
এলাকার প্রবীণ ও তরুণদের মতে, আব্দুর রহমানের মতো স্বাবলম্বী ও মানবিক মানুষ জনপ্রতিনিধি হলে এলাকার দীর্ঘদিনের অবহেলিত রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে তারা আব্দুর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা কুইন’ পরিবারের সার্বিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করছেন।
পড়ুন: আসিফ মাহমুদসহ ৪ জনের দুর্নীতির সত্যতা পেয়েছে দুদক
আর/


