লোহিত সাগরের উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোচা দখলে নিয়েছে ইরানসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। তাদের এই অভিযানে ইরান সরাসরি অস্ত্র ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোচা দখলের ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপরও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি দিকনির্দেশনা ছিল বলে জানিয়েছেন ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলতেই হুতিদের এই অভিযানে সহায়তা করেছে ইরান।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মোচা দখলের মাধ্যমে বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে হুতিরা। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে ইরানের অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের ছয় মাসের মাথায় বাব আল-মান্দাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারের দিকে নজর দিয়েছে হুতিরা। অন্যদিকে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট সরকারি বাহিনী ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালাতে ব্যস্ত রয়েছে।
দুটি ইরানি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহে হুতিদের সৌদি আরবে হামলা আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেয় ইরান। একই সঙ্গে এসব হামলায় সহায়তার জন্য অতিরিক্ত অর্থ, অস্ত্র ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
ইরান হুতিদের মিত্র হিসেবে উল্লেখ করলেও তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, হুতিরা ইরানের ‘প্রক্সি’ বা নিয়ন্ত্রিত কোনো গোষ্ঠী নয়।
তেহরানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এক আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, সামরিক কৌশল নিয়ে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর আইআরজিসির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইতোমধ্যে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা তদারকি ও পরিচালনা করেছেন।
তবে আরেক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হুতিসহ মিত্রদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে ইরান। কিন্তু মোচায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত ইরানের নয়, হুতিদের নিজেদের। তার মতে, তবে এই অভিযান ইরানের জন্যও লাভজনক হয়েছে। কারণ এর ফলে তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পাঁচ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লোহিত সাগর উপকূলের তিহামা নামে পরিচিত সমতল ও সরু এলাকায় হুতিদের নতুন অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে আইআরজিসি। এর ফলে শুরুতেই ব্যাপক রকেট হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনের সামরিক কর্মকর্তারা আটক হুতি যোদ্ধাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, তাদের ধারণা, ইরানের এই অভিযান পরিচালনা করছেন আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার আবদোলরেজা শাহলায়ি। তবে ইরানি সূত্রগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। এর আগে তারা জানিয়েছিল, আইআরজিসির বিশেষায়িত কুদস ফোর্সের সদস্য শাহলায়ি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনে সময় কাটিয়েছেন।
ইরানি সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আকাশ ও সমুদ্রপথে অবরোধ থাকা সত্ত্বেও আইআরজিসি ইয়েমেনে অস্ত্র ও লোকবল আনা-নেয়া করতে সক্ষম হয়েছে। তবে কীভাবে তা সম্ভব হয়েছে, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, ‘পশ্চিম উপকূলে হুতিদের এই অভিযান গত সপ্তাহ বা গত মাসে হঠাৎ করে প্রস্তুত করা হয়নি’। তার মতে, যুদ্ধে মোচা দখল হুতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
নাগি বলেন, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে তাদের পাওয়া নতুন অস্ত্র। এসব অস্ত্র সরাসরি ইরানের কাছ থেকে অথবা বিভিন্ন চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসেছে। সর্বশেষ অভিযানে হুতিদের ড্রোন ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে হুতিরা মোচার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবের কাছে আরও বিমান সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা চায় বলে জানিয়েছেন দেশটির আরও দুই কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সরকার হুতিদের শক্ত ঘাঁটি সানা এবং তেল সংরক্ষণাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনায় সৌদিকে বিমান হামলা চালাতে বলেছিল।
তবে সৌদি আরব রসদ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তার পাশাপাশি সীমিত আকারে বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল জাওফ ও মারিব প্রদেশের উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র। ইয়েমেন সরকার এসব এলাকাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হলো, হুতিদের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চাইছে রিয়াদ। কারণ এতে সৌদি ভূখণ্ডে আরও ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং লোহিত সাগর উপকূলসহ হুতিদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে কেন বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছে না—এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি সৌদি কর্মকর্তারা।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই বন্ধ ছিল। ফলে দেশটির সামগ্রিক সামরিক পরিস্থিতি এখন কতটা বদলেছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। ইরান ও সৌদি আরব—দুই দেশই ইয়েমেনে নিজেদের সমর্থিত বাহিনীর পেছনে বিনিয়োগ করেছে। তবে ইয়েমেন সরকারের সমর্থক জোটের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে।
পড়ুন: ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে পুতিন
আর/


