বিজ্ঞাপন

জবির সেই শিক্ষার্থী নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেত্রী, বিলুপ্ত র‍্যাবকে ঘিরে বিতর্ক!

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের হওয়া চুরি ও অর্থ আত্মসাতের মামলার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দিগ্ধ আসামি মমতাজ ওরফে বর্ষাকে তদন্তের স্বার্থে আটক করতে র‍্যাবের একটি আভিযানিক দল সেখানে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলে র‍্যাব সদস্যদের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

মমতাজ ওরফে বর্ষাকে আটকের একপর্যায়ে সেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের কয়েকজন প্রতিনিধি এবং ১৫–২০ জন সাধারণ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী উপস্থিত হন। একপর্যায়ে সেখানে একটি মবের সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় র‍্যাব সদস্যরা বর্ষাকে সহকারী প্রক্টরের জিম্মায় রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সেদিনই বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে প্রথম আলো, কালবেলা, বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ও অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে মমতাজ ওরফে বর্ষাকে একটি স্বর্ণ-চোরাচালান গ্রুপের সদস্য হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকার বিষয়ও উঠে আসে।

তবে ঘটনার পেছনের প্রকৃত বিষয় জানতে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্তকারী কর্মকর্তা মমতাজ ওরফে বর্ষাকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে আটক করার জন্য র‍্যাবের সহায়তা চেয়ে অধিযাচনপত্র পাঠান। ওই অধিযাচনপত্র প্রাপ্তির পর র‍্যাব-২-এর একটি দল সকল প্রকার আইনানুগ বাধ্যবাধকতা মেনে একজন কমান্ডিং অফিসারের উপস্থিতিতে অভিযান পরিচালনা করে।

ঘটনার পরপরই গণমাধ্যমে পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে মমতাজ ওরফে বর্ষাকে গ্রেফতার কিংবা গুম করার চেষ্টা করা হয়েছে এমন যেসব অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে, আমাদের অনুসন্ধানে সেসব দাবির পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বরং সেদিন জবি শিক্ষার্থীদের পাওয়া নিরাপত্তা ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার দায়ের করা মামলার হাত থেকে বাঁচতে ছলচাতুরি করার পাশাপাশি র‍্যাবকে ঘিরে বিতর্ক করা চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে মমতাজ ওরফে বর্ষার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা বা তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদকের হাতে আসা বেশ কয়েকটি ছবি ও সূত্রের দাবি, মমতাজ ওরফে বর্ষা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং ক্যাম্পাসে দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়। একই সঙ্গে গত এক থেকে দেড় বছর ধরে তিনি একটি স্বর্ণ-চোরাচালান চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন বলেও কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মমতাজ ওরফে বর্ষার এক রুমমেট জানান, বর্ষা টিউশনি করে প্রতিমাসে মাত্র ৭ হাজার টাকা পেতেন এবং তিনি দুই সিট নিয়ে একাই থাকতেন, যার ভাড়া ছিল ৬ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি আরও জানান, বর্ষা তার মোবাইল নম্বর বা সঠিক পরিচয় তার রুমমেট কাউকেই কখনো দিতেন না। তিনি আরো বলেন, বর্ষা প্রায় সারাদিনই বিভিন্ন মানুষের সাথে মোবাইলে কথা বলতেন ও তার লাইফস্টাইল আর চলাফেরা ছিলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সবার থেকে আলাদা।

বর্ষা যে ভবনে থাকতেন, সেই ভবনের দারোয়ান জানিয়েছেন, র‍্যাব অভিযান চালানোর আরও ১০–১৫ দিন আগে থেকেই বর্ষা তাকে বারবার বলেছিলেন, কেউ যদি তাকে খুঁজতে আসে বা তার বিষয়ে জিজ্ঞেস করে, তাহলে যেন জানানো হয় যে তিনি ওই বিল্ডিংয়ে থাকেন না এবং তাকে চেনেন না।

প্রতিবেদকের হাতে আসা মমতাজ ওরফে বর্ষার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নথি এবং তাকে গ্রেফতার বা আটক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো অধিযাচনপত্র এসেছে। নথিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট মামলায় মমতাজ ওরফে বর্ষার নাম স্পষ্টভাবে এজাহারে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে রয়েছে।

তাকে আটক করতে র‍্যাবের অভিযানটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা আকস্মিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল এমন দাবির সঙ্গে পাওয়া নথিপত্রের তথ্যের কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, র‍্যাব তাদের নিজস্ব আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এজাহারনামীয় সন্দিগ্ধ আসামি মমতাজ ওরফে বর্ষাকে আটক করতে গিয়েছিল। তবে ঘটনাস্থলে একপর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে এবং কতিপয় ব্যক্তিবর্গ সেখানে মবের সৃষ্টি করে।

অনুসন্ধানকালে ঘটনার দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের সঙ্গে একজন ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপও আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে সহকারী প্রক্টরকে বলতে শোনা যায়, তিনি জানতেন না যে বর্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং তিনি একটি মামলার এজাহারনামীয় আসামি।

কথোপকথনে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, কিছু শিক্ষার্থীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। পরবর্তী কথোপকথনে তাকে বলতে শোনা যায়, তারা যদি জানতেন যে বর্ষা চুরির মামলার আসামি, তাহলে তারা তাকে নিয়ে যেতে বাধা দিতেন না।

র‍্যাবের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, র‍্যাব যথাযথ আইন মেনেই সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহারনামীয় সন্দিগ্ধ আসামি মমতাজ ওরফে বর্ষাকে আটকের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতার কারণে র‍্যাব সদস্যরা এক ধরনের মব পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

সম্প্রতি প্রকাশ হওয়া আরেকটি গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, অভিযানে হাফ প্যান্ট পড়া সেই ব্যক্তিটি র‍্যাবের সদস্য ছিল যাকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তবে র‍্যাবের দাবি অবস্থানরত সেই ব্যক্তিটি র‍্যাবের কেউ নন বরং আসামি সনাক্ত করতে লোকেটর হিসেবে তাকে ব্যবহার করা হয়েছে।

সচেতন নাগরিকের মতে, র‍্যাবের সেদিনের অভিযান মবের মাধ্যমে বানচাল হলেও সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি গুষ্টি আইনশৃঙ্খলার অবনতি করার জন্যই র‍্যাবের এই বিতর্ক বারবার সামনে আনছে। এমনিতেই পুলিশ দুর্বল,আর র‍্যাবের এই দুর্বলতার মাধ্যমে কুচক্রী মহল সুযোগ নিবে।

আইন বিশেষজ্ঞের মতে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং আইনগত দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। তার মতে, কোনো মামলার এজাহারনামীয় বা সন্দিগ্ধ আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া বেআইনি কোনো বিষয় নয়; তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও অবশ্যই নির্ধারিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তবে যারা এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিয়ে র্যাবের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা ঘটনার সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের আইনগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে র‍্যাবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর জন্য নিজেদের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে জনগণের আস্থা ও হারিয়ে যাওয়া সুনাম পুনরুদ্ধার করাও জরুরি।

পড়ুন : দণ্ডিত ৫ জনের সম্পত্তির অর্ধেক জুলাই শহীদ পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন