মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা পরিপালন বা কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন এ নির্দেশনার আওতায় ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
মঙ্গলবার বিএফআইইউর জারি করা এক সার্কুলারে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সার্কুলারটি পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষকে জানানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলার অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট বা সেন্ট্রাল কমপ্লায়েন্স ইউনিট (সিসিইউ) গঠন করতে হবে। এই ইউনিট প্রতিষ্ঠানের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত কার্যক্রমের কেন্দ্রীয়ভাবে তদারকি করবে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শাখা পর্যায়েও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে। এ জন্য প্রতিটি শাখায় ব্রাঞ্চ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার (বিএএমএলকো) নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো গ্রাহকের লেনদেনে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা গেলে তা প্রাথমিকভাবে বিএএমএলকোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটকে জানাতে হবে।
বিএফআইইউর নির্দেশনায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নিজস্ব সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করতে বলা হয়েছে। এসব নীতিমালায় গ্রাহক যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
নতুন ব্যবস্থায় গ্রাহক ও প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় শনাক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাচাই করতে হবে, তাদের গ্রাহক বা কোনো হিসাবের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মধ্যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পলিটিক্যালি এক্সপোজড পারসন (পিইপি) রয়েছেন কি না। এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত যাচাই ও নজরদারি করতে হবে।
গ্রাহকের হিসাব খোলার সময় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন সনদসহ গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্রের মাধ্যমে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি পদ্ধতিও ব্যবহার করা যাবে।
শুধু হিসাব খোলার সময় তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না, গ্রাহকের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও যাচাই করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের ধরন পরিবর্তিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
বিএফআইইউর সার্কুলারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন রেজুলুশন এবং বাংলাদেশ সরকারের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা নিষিদ্ধ সত্তার সঙ্গে কোনো গ্রাহকের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে।
গ্রাহকদের লেনদেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো লেনদেন অস্বাভাবিক, জটিল, অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা আপাতদৃষ্টিতে অবৈধ বলে মনে হলে তা দ্রুত শাখা পর্যায়ের বিএএমএলকোকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। এরপর বিষয়টি কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটের মাধ্যমে যাচাই ও বিশ্লেষণ করতে হবে।
কোনো লেনদেন সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত হলে গোএএমএল ওয়েবের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বিএফআইইউকে রিপোর্ট করতে হবে। এ ধরনের রিপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গ্রাহক বা অন্য কোনো অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট করার বিষয়টি প্রকাশ করা যাবে না।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য প্রতি ছয় মাসে স্ব-মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত চেকলিস্টের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে।
বিএফআইইউ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পুঁজিবাজারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীদের নিয়োগের আগে তাদের পরিচয়, পেশাগত যোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ ছাড়া গ্রাহকের হিসাব বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হিসাব বন্ধ বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হওয়ার তারিখ থেকে অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত গ্রাহক, হিসাব এবং লেনদেনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল সংরক্ষণ করতে হবে।
বিএফআইইউর এই নির্দেশনার ফলে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কমপ্লায়েন্স কাঠামো আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও জবাবদিহিমূলক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ এবং সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ঠেকাতে এসব ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পুঁজিবাজারে বৈধ বিনিয়োগের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়। তাই এ খাতে অবৈধ অর্থ প্রবেশ বা অর্থের উৎস গোপন করার সম্ভাবনা ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে বিএফআইইউ সেই নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ পরিপালন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হবে নির্ধারিত সময় ও কাঠামো অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠন, প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা নিয়োগ এবং নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে নিয়মিত স্ব-মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবস্থাগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পড়ুন:বেকারি পণ্যের দাম আপাতত বাড়ছে না
ইমি/


