বেকারি পণ্যের (বিস্কিট ও ব্রেড) মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় সম্প্রতি বেকারি পণ্যের মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ঘোষণাসহ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনার পর ব্যবসায়ী নেতারা বিস্কিট ও ব্রেডের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মতি দেন।
এদিকে বেকারি পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, কর ও শুল্কসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সভায় সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত না করে জনস্বার্থ ও ভোক্তাদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেয়া হবে। একই সঙ্গে যৌক্তিক মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, বেকারি পণ্য ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বেকারি পণ্যের কাঁচামাল ও জ্বালানির সংকট কাটাতে হবে
আধুনিক নগরজীবনে বেকারিপণ্য এখন প্রায় অপরিহার্য। দ্রুত ক্ষুধা মেটাতে অনেকেই রুটি, কেক ও বিস্কুটের ওপর নির্ভর করেন। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের এই সময়ে নগরবাসীর একটি বড় অংশের কাছে এসব খাবার হয়ে উঠেছে সহজ ভরসা।
এর মধ্যেই শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ার কথা ছিল ২০ শতাংশ। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ আরও বেড়ে যেত। রিকশাচালক, দিনমজুরসহ নিম্নআয়ের মানুষের অনেকেই তুলনামূলক কম দামের বনরুটি, পাউরুটি কিংবা কেক দিয়ে ক্ষুধা মেটান। ফলে এসব খাবারের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি এর প্রভাব পড়বে।
বেকারি মালিকদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এক বছরের ব্যবধানে ৫০ কেজি ময়দার দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ২০০ টাকা। একই পরিমাণ চিনির বস্তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। বেড়েছে ভোজ্য তেল ও ডালডার দামও। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক বেকারিকে অতিরিক্ত খরচ করে এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক। তাই বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না। তবে প্রশ্ন হলো, বেকারি পণ্য উৎপাদনে বাড়তি খরচের পুরো দায়ই কি ভোক্তাদের ওপর চাপানো হবে?
বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কিছু বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাোর কথা ছিল। আবার কোনো কোনো পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখে ওজন কমানোর কথাও বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪০০ গ্রাম পাউরুটির ওজন কমিয়ে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রাম করা হতে পারে। ১০ টাকার বনরুটির ওজনও কমানোর কথা রয়েছে।
দাম অপরিবর্তিত রেখে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া কার্যত মূল্যবৃদ্ধিরই আরেকটি পদ্ধতি। ভোক্তাকে সঠিক তথ্য না জানিয়ে পণ্যের ওজন কমানো আইনসিদ্ধ কি না, সেটিও জানা প্রয়োজন। দাম একই রাখার জন্য কোনো পণ্যের ওজন কমানো হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা করা উচিত। একই সঙ্গে পণ্যের মোড়কে দাম ও ওজন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
শুধু বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধিই মানুষের উদ্বেগের কারণ নয়। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও যখন বাড়ছে, ঠিক সেই সময় বেকারি পণ্যের দাম বাড়ল। সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর পরও তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। খোলা আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে।
বর্তমানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম কমবেশি ১৫০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির জন্য কেজিপ্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। কোনো কোনো সবজির দাম কম থাকলেও কিছু সবজির দাম ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মাছের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মানুষের আয় বাড়ছে না, অথচ ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছেই। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতিদিনের বাজারের তালিকা আরও ছোট করছেন তারা।
মূল্যস্ফীতি কমেছে—এর অর্থ এই নয় যে দ্রব্যমূল্য কমেছে কিংবা স্থির হয়ে গেছে। বরং পণ্যের দাম বাড়ার গতি হয়তো কিছুটা কমেছে। কিন্তু মানুষের আয় না বাড়লে কিংবা কর্মসংস্থান হারিয়ে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেলে মূল্যস্ফীতির এই ধীরগতিও তাদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে না।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মানুষের আয়ের পথও তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে বেকারি শিল্পের কাঁচামালের বাজার স্থিতিশীল করতে হবে। স্বাভাবিক করতে হবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে বেকারি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
পড়ুন : ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ পিডিবির
সা/


