৫৯ লাখ সুবিধাভোগীকে টিসিবি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবি পণ্য বিক্রি কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
এ সময় মন্ত্রী বলেন, সরবরাহ ও সাপ্লাই চেইনের মধ্য একটা বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে বাজারে এখনো স্থিতিশীলতা নেই। ভর্তুকির মাধ্যমে টিসিবি যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা দেশের মানুষের জন্য উপকারী হবে বলেও মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, টিসিবির কার্ড ডিজিটাল রূপান্তর করার ফলে, ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, টিসিবির কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলেও যাতে কার্ডধারীরা পণ্য পাওয়া থেকে বাদ না পড়েন, সে ব্যবস্থা করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে এ সেবা আরও সহজ করা হবে।
ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনলাইন ডিলার সিস্টেম চালু করা হবে। প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লটারি করা হবে।
টিসিবি কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড বাছাই
যাচাই-বাছাই শেষে ১ কোটি কার্ডের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এসব ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরকার দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প আয়ের মানুষকে ভর্তুকি মূল্যে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ করে আসছে।
টিসিবির মুখপাত্র ও উপপরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. শাহাদত হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখের কাছাকাছি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ ৫০ হাজার কার্ড সক্রিয় আছে; যেসব কার্ডে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য কেনা যাচ্ছে। বাকি ৬ লাখ কার্ড সম্প্রতি বিতরণ করা হয়েছে; এগুলো অ্যাকটিভেশন পর্যায়ে আছে।
টিসিবির মুখপাত্র আরও জানান, এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে ২৩ লাখের ডাটা এখনও পাওয়া যায়নি। বাকি ৭৭ লাখের মধ্যে ৭০ লাখের কাছাকাছি বিতরণ হয়ে গেছে।
বাকি ৭ লাখের বেশি কার্ডের ডাটা টিসিবির কাছে আছে। এই কার্ডগুলো বিতরণের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে। টার্গেট অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে।
টিসিবি সূত্র জানায়, বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ফ্যামিলি কার্ডধারীদের কাছে সয়াবিন তেল, মশুর ডাল, চিনি, ছোলা, আলু, পেঁয়াজ, খেজুর, রাইস ব্রান তেল, পাম তেল, সূর্যমুখী তেল, ক্যানোলা তেল, ডিটারজেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হয়।
কার্ডের মাধ্যমে ৩০ টাকা কেজি দরে ৫ কেজি চাল, ৬০ টাকা দরে ২ কেজি মশুর ডাল, ১০০ টাকা লিটার দরে ২ লিটার সয়াবিন তেল এবং ৭০ টাকা কেজি দরে চিনি কিনেছেন কার্ডধারীরা। ভর্তুকি মূল্যে সাবানও কিনছেন ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে।
ফ্যামিলি কার্ডে আরও বেশি আইটেম ও পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তারা বলেন, ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে তারা কম দামে এসব পণ্য কিনতে পারছেন, এসব পণ্যের মানও বেশ ভালো। তবে আইটেম এবং পরিমাণ বাড়ানো উচিত। কারণ এত কমে আসলে একটা পরিবারের হয় না।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে টিসিবি স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি করে আসছে। করোনা মহামারীর সময় এই সেবার পরিধি বাড়ানো হয়। টিসিবির এই সেবাকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করার জন্য ২০২২ সালে এক কোটি ফ্যামিলি কার্ড দেয় সরকার। পরবর্তীতে সেটিকে আরও আধুনিকায়ন করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে উদ্যোগ নেয় এবং ভুয়া ও দলীয় বিবেচনায় দেওয়া স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বাতিল করে। যাছাই-বাছাই শেষে সত্যিকারের স্বল্প আয়ের মানুষকে এই কার্ড বিতরণ শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি কার্ডের মধ্যে ৭০ লাখ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন করে টিসিবি।
ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাসমূহ
এই কার্ডের মাধ্যমে মূলত দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সাশ্রয়ী মূল্যে কেনা যায়। প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
ভর্তুকি মূল্যে পণ্য ক্রয়: স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারীরা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে নির্দিষ্ট পরিমাণ সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা এবং খেজুর (বিশেষ করে রমজান মাসে) কিনতে পারেন।
সরাসরি সহায়তা: কার্ডের মাধ্যমে একজন ক্রেতা সাধারণত ২ লিটার সয়াবিন তেল, ২ কেজি মসুর ডাল এবং ১ কেজি চিনিসহ অন্যান্য পণ্য একটি প্যাকেজ হিসেবে পান।
মূল্য ছাড়ের সুবিধা: সাধারণ ভ্রাম্যমাণ ট্রাক সেল থেকে পণ্য কেনার চেয়ে স্মার্ট কার্ডধারীদের জন্য প্রতি প্যাকেজে বা প্রতি কেজিতে বাড়তি ১০-৩০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হয়।
নতুন প্রস্তাবনা (ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা): রাজনৈতিক অঙ্গন ও সরকারি বিভিন্ন আলোচনায় নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে এই কার্ডের মাধ্যমে মাসে ২,৫০০ টাকা নগদ প্রদান বা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
কারা এই কার্ডের জন্য প্রযোজ্য?
ফ্যামিলি কার্ডটি সবার জন্য নয়; এটি নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়:
নিম্নআয়ের মানুষ: সমাজের হতদরিদ্র এবং যাদের আয় সীমিত (বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক বা নিম্নবিত্ত শ্রমিক)।
প্রান্তিক ও দুস্থ পরিবার: গ্রামীণ ও শহর এলাকার সুবিধাবঞ্চিত পরিবার।
পরিবারের গৃহকর্ত্রী: নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পরিবারের নারী বা গৃহিণীদের নামে এই কার্ড করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নির্দিষ্ট এলাকা: সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়া নাগরিকরা।
কিভাবে কার্ড পাওয়া যায়?
বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৬৬-৭০ লাখ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয় রয়েছে। আপনি যদি এর আওতায় আসতে চান তবে: ১. আপনার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। ২. আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে অনলাইনে বা নির্দিষ্ট ফরম পূরণের মাধ্যমে আবেদন করা যায় কিনা তা যাচাই করতে পারেন।
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে কি টিসিবি পন্য পাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেই মূলত টিসিবি (TCB) পণ্য পাওয়া যাবে। বর্তমানে সরকার আগের সাধারণ ফ্যামিলি কার্ডগুলোকে ডিজিটাল বা ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডে’ রূপান্তর করছে যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষ এই সুবিধা পায়।
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে টিসিবি পণ্য পাওয়ার মূল বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. পণ্য ক্রয়: এই কার্ড প্রদর্শন করে আপনি টিসিবির নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে ভরতুকিযুক্ত পণ্য (যেমন: সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও চিনি) কিনতে পারবেন।
২. কার্ডের প্রয়োজনীয়তা: সরকার ঘোষণা করেছে যে, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ছাড়া ভবিষ্যতে টিসিবির পণ্য আর পাওয়া যাবে না। তাই যাদের কাছে পুরনো হাতে লেখা কার্ড আছে, তাদের ডিজিটাল বা স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।
৩. প্রক্রিয়া: স্মার্ট কার্ডের কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে ডিলাররা পণ্য বুঝিয়ে দেবেন। এতে একই ব্যক্তি বারবার পণ্য নেওয়া বা ভুয়া কার্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
৪. সুবিধাভোগী: বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ১ কোটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ: স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড মূলত টিসিবি পণ্য পাওয়ার ডিজিটাল চাবিকাঠি। আপনার এলাকায় টিসিবির ট্রাক বা স্থায়ী দোকানে এই কার্ড নিয়ে গেলেই আপনি সরকার নির্ধারিত মূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।
পড়ুন : র্যাব যেভাবে বিলুপ্ত হলো, এসআরবি গঠনের গেজেট প্রকাশ
সা/


