বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র থেকে গানভরের প্রথম এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চুক্তির আওতায় কেনা প্রথম কার্গো দেশে পৌঁছেছে। ‘এলএনজি জেনেভা’ নামের জাহাজে আসা কার্গোটি সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে খালাস করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভরের সঙ্গে করা ১৩ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় মোট ১১৭ কার্গো এলএনজি আমদানি করবে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছর দেশে আসবে মোট পাঁচটি এলএনজি কার্গো।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এই চুক্তি করেছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় চুক্তির প্রথম কার্গো নিয়ে ‘এলএনজি জেনেভা’ জাহাজটি বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়।

পরে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে সামিটের এফএসআরইউতে কার্গোটির খালাস কার্যক্রম শুরু হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির প্রথম চালান দেশে সরবরাহ করা হলো।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র এআরটি চুক্তির শর্ত ও প্রভাব

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওয়াশিংটনে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

সরকারের দাবি, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে শুল্কও কমবে। তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি খাতে যে শর্ত রয়েছে:

চুক্তির কয়েকটি ধারায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে মার্কিন এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির বিষয়টি।

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) মার্কিন এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কিনবে বলে উল্লেখ রয়েছে।

পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়েও চুক্তিতে একটি ধারা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা কৌশলগত স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হতে পারে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধের কথাও রয়েছে।

চুক্তির এসব শর্তের কারণে ভবিষ্যতে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কখনো কাতার, ওমান বা অন্য কোনো দেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতার কারণে সেই সুযোগ সীমিত হতে পারে।

রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বা জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে যা বলা হয়েছে:

চুক্তির অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা (৪ নম্বর ধারা) অংশে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ও রাখা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি দেশ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার ইঙ্গিতও রয়েছে।

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকে সে বিষয়ে আলোচনা করে ‘সহায়ক’ বা ‘পরিপূরক’ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ কারণে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বা যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’ বাংলাদেশকে কার্যত একই অবস্থানে দাঁড়াতে হতে পারে, যা দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ চীন ও রাশিয়া থেকে আসে। ভবিষ্যতে এসব উৎস থেকে কেনাকাটা সীমিত হলে ব্যয় ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক নীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে:

চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

একটি ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি ‘নন-মার্কেট ইকোনমি হিসেবে চিহ্নিত কোনো দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, যা এই এআরটি চুক্তিকে দুর্বল করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল বা উচ্চ শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত চীন, রাশিয়া ও ভিয়েতনামকে এ ধরনের তালিকায় রেখেছে। নন-মার্কেট ইকোনমি ব্যবস্থায় পণ্যের দাম পুরোপুরি বাজারের নিয়মে নির্ধারিত হয় না।

ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো নতুন চুক্তি করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা রাখে।

এ ছাড়া খনিজ সম্পদ, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিও চুক্তির আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। এতে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে দেওয়া বিভিন্ন ভর্তুকির তথ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজার প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে—এমন ভর্তুকি কমানো বা বন্ধের বিষয়ও এতে রয়েছে।

বাংলাদেশ এখনো একটি বিকাশমান অর্থনীতি। দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার বিভিন্ন সময়ে নগদ সহায়তা, কর ছাড় বা ভর্তুকি দিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে এসব নীতিগত সুযোগ সীমিত হলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম নিয়ে আলোচনা:

চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শুল্ক প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে বলে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মোট দুই দফায় শুল্ক আরোপ করলেও মার্কিন আদালত তা বাতিল করে। ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক এখন ঠিক কত শতাংশ, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন)’ নীতির প্রশ্ন উঠতে পারে। এই নীতি অনুযায়ী, একটি দেশকে দেওয়া বিশেষ শুল্ক সুবিধা অন্য সদস্য দেশগুলোকেও দিতে হয়।

ফলে বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া সুবিধা অন্য দেশগুলোকেও দেয়, তাহলে রাজস্বে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। আর যদি তা না করে, তাহলে ডব্লিউটিওর নিয়ম নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পড়ুন : সৌদি আরবকে ৪৮ টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন