জমি দখল, ব্যবসায় অংশীদারত্ব দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হত্যার হুমকির অভিযোগ উঠেছে ঢাকার ধামরাই উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাফিজুল ইসলাম রবিনের বিরুদ্ধে। ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যক্তি এসব অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে জমি ও ব্যবসাসংক্রান্ত বিরোধে হস্তক্ষেপ করছেন রবিন। এতে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় চান্দ্রাইল মৌজায় অবসরপ্রাপ্ত এক নৌ কর্মকর্তার জমিতে সাইনবোর্ড লাগানো, ১৯৭০ সালে কেনা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, ব্যবসায়ীকে বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো এবং ইসলামপুরে একটি বালুর গদির ৫০ শতাংশ অংশ দাবি করার মতো ঘটনায় রবিনের নাম এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রবিন। তাঁর দাবি, একটি পক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাঁকে হেয় করতে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। জমির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেই তিনি বৈধভাবে বায়না করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
জমিতে সাইনবোর্ড, পরে হত্যার হুমকির অভিযোগ
ধামরাইয়ের বড় চান্দ্রাইল মৌজার ৩৩০ নম্বর দাগের ১০ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের কথা জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য মো. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। তাঁর দাবি, ২০০৮ সালে স্থানীয় আব্দুর রশিদের কাছ থেকে জমিটি কেনেন তিনি। পরে খাজনা-খারিজ ও নামজারি সম্পন্ন করে জমিটি ভোগদখলে রাখেন।
আরিফুর রহমানের অভিযোগ, সম্প্রতি তাঁর জমিতে থাকা সাইনবোর্ডের ওপর আরেকটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন রবিন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিজে গিয়ে সেটি সরানোর উদ্যোগ নেননি বলে জানান তিনি। বিষয়টি জানিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন বলেও দাবি করেন।
জমির বিরোধ নিরসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছেও আবেদন করেন আরিফুর। তাঁর ভাষ্য, এ বিষয়ে প্রথম শুনানি হয়েছে এবং পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হলে তিনি তা জমা দেন। তবে এখনো বিরোধের সমাধান হয়নি।
আরিফুর বলেন, যে ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কিনেছেন, তাঁর নামেই খাজনা-খারিজ ও নামজারি ছিল। পর্চা ও আরএস খতিয়ানেও তাঁদের নাম রয়েছে।
এই বিরোধের মধ্যে গত ৩ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি ফোন করে তাঁকে হুমকি দেন।
ফোনালাপের একটি রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তবে রেকর্ডটির সত্যতা এবং ফোনকারী ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফোনকলের সঙ্গে রবিনের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানাননি আরিফুর।
তিনি জানান, ইউএনওকে বিষয়টি জানানোর পর তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী ধামরাই থানায় অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর একই ব্যক্তি আরও কয়েকবার ফোন করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
১৯৭০ সালের জমি নিয়ে নতুন বিরোধ
ধামরাইয়ের আরেকটি জমির মালিকানা নিয়ে রবিনের সঙ্গে বিরোধের কথা জানিয়েছেন মো. কামরুল হাসান সোহেল।
কামরুলের দাবি, তাঁর বাবা ১৯৭০ সালে নেসাহা খাতুনের কাছ থেকে সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে জমি কেনেন। মোট ২২ শতাংশ জমির মধ্যে ৮ শতাংশে তাঁদের মালিকানা রয়েছে। ১৯৭০ সাল থেকে তাঁরা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
কামরুলের ভাষ্য, সম্প্রতি জানতে পারেন, নেসাহা খাতুনের ১১ ওয়ারিশের মধ্যে দুই ছেলে বকুল ও খুরশেদ তাঁদের কথিত অংশ রবিনের কাছে বিক্রি করেছেন। এরপর রবিন জমিটি দখলের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একবার জমিতে বালি ফেলার সময় রবিন সেখানে গিয়ে বাধা দেন বলেও দাবি করেন কামরুল।
পরিবারটির সদস্যদের ভাষ্য, জমিটির আগের মালিকের ওয়ারিশেরা একসময় তাঁদের মা জমিটি বিক্রি করেননি বলে দাবি করেছিলেন। পরে পুরোনো দলিল দেখানোর পর তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর ২০২৩ বা ২০২৪ সালে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে তাঁরা কনফার্মেশন ডিড করেন।
তাঁদের দাবি, ওই দলিলে নেসাহা খাতুনের আটজন ওয়ারিশ জমি হস্তান্তরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর রবিন তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
জমিতে বালি ফেলা, বাঁশের ঘাট দেওয়া ও সাইনবোর্ড স্থাপনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে অভিযোগ করেছেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
রবিনের বক্তব্য
জমি নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে রবিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেই তিনি বৈধভাবে জমি বায়না করেছেন। এ জন্য ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
তাঁর দাবি, এসএ ও আরএস রেকর্ড, নামজারি-খারিজসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা হয়েছে। জমির মালিক রমজান আলী ও তাঁর ছেলে উপস্থিত থেকে জমি বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলেও দাবি করেন রবিন।
তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রদল হিসেবে কী করে খাব? আমার তো ফ্যামিলি আছে। ছাত্রদল করে কি বৈধ ব্যবসা করতে পারব না? আমার তো আর কোনো ব্যবসা নাই।’
জমির মালিক রমজান আলী বলেন, জমিটি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি। টাকার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি নিজেই রবিনের কাছে জমি বিক্রির জন্য বায়না করেছেন। জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
ব্যবসায়ীর বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ
জমিসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে রবিনের বিরুদ্ধে।
গত ১৪ আগস্ট রবিনের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাঁকে ১০ থেকে ১৫ জন সহযোগীসহ সাদ্দামের বাড়ির সামনে এক নারীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটি করতে দেখা যায়। ভিডিওতে রবিনের কিছু বক্তব্যও শোনা যায়, যা সাদ্দামকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা হচ্ছে।
রবিনের দাবি, ডাউটিয়া এলাকায় ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিল হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, সাদ্দাম ওই মিছিলে অর্থায়ন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁকে সতর্ক করতে সাদ্দামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে কিছু হইচই ও চিৎকার-চেঁচামেচি হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তবে সাদ্দামের দাবি, রবিনের সহযোগী জাকারিয়ার সঙ্গে তাঁর পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেই তাঁকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসানো ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
সাদ্দাম জানান, ওই মামলায় তাঁকে তিন মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে। জামিনে বের হওয়ার পরও হুমকি অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ভয়ে বাড়ি ও দোকানে থাকতে পারেন না বলেও জানান সাদ্দাম।
তাঁর মা ও স্ত্রীও তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
বালুর গদিতে ৫০ শতাংশ অংশ দাবি
ধামরাইয়ের ইসলামপুরে ‘আব্দুল আজিজ ট্রেডিং’ নামে বালুর গদি পরিচালনা করেন ব্যবসায়ী মোস্তফা সাইদুজ্জামান। তাঁর অভিযোগ, রবিন সম্প্রতি ব্যবসাটির ৫০ শতাংশ অংশ দাবি করেছেন। এ ঘটনায় গত ১০ জুলাই ধামরাই থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগপত্রে মোস্তফা উল্লেখ করেন, সিয়াম নামের এক ব্যক্তির কাছে বালুর মূল্য বাবদ তাঁর ৪০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। গত ৭ জুলাই রাতে সিয়াম টাকা পরিশোধের জন্য সময় চাইলে তিনি চার কিস্তিতে টাকা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণ পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে রবিন সেখানে গিয়ে মোস্তফাকে ধমক দেন এবং ব্যবসায় ৫০ শতাংশ অংশ দাবি করেন। এতে রাজি না হলে তাঁকে ‘আস্ত পুঁতে ফেলার’ হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন সকালের মধ্যে অংশ না দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গদি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয় বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন মোস্তফা। পরে ইসলামপুর বাসস্ট্যান্ডে রবিন প্রশাসনকে গদি বন্ধ করার কথা বলেন এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার পর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোস্তফা।
এই অভিযোগের বিষয়ে রবিনের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ছাত্রদলের কারণ দর্শানোর নোটিশ
ব্যবসায়ী সাদ্দামের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগসহ বিভিন্ন ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর রবিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদল।
গত ১২ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ তমিজ উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইকবাল স্বাক্ষরিত নোটিশে রবিনকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। দায়িত্বে অবহেলার কারণে কেন তাঁর বিরুদ্ধে স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে কোনো অপকর্মের সুযোগ নেই।’
অভিযোগ তদন্তের জন্য রবিনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত শেষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের বক্তব্য
সাদ্দামকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। কেউ আক্রান্তবোধ করলে আইনের সহায়তা নিতে পারেন। অভিযোগ পেলে পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান বলেন, জমি দখল ও সাইনবোর্ড লাগানোকে কেন্দ্র করে একটি অভিযোগ থানায় এসেছিল বলে তিনি জানেন। তবে পরে ওই অভিযোগের কী সমাধান হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই।
সব অভিযোগের বিষয়ে রবিন আবারও দাবি করেন, একটি মহল তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। জমি দখল, ব্যবসায় অংশ দাবি ও হুমকির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
পড়ুন : চট্টগ্রামের শীর্ষ ছিনতাইকারী বিজয় গ্রেপ্তার!
সা/


