সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের কাছে বিক্রির বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
প্রায় ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির আওতায় সৌদির হাতে যাবে বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমান। তবে সৌদির হাতে এফ-৩৫ তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগের পাশাপাশি চীনের সম্ভাব্য গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ‘প্রস্তাবিত এই বিক্রি উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্তি হিসেবে কাজ করা ন্যাটোর বাইরের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের নিরাপত্তা জোরদার করবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যও এগিয়ে যাবে।’
ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ বিক্রি করলেও ‘অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন হবে না’। দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ওই নীতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা অবশ্যই এগিয়ে থাকতে হবে।
এমন সময় এ ঘোষণা এলো, যখন ইয়েমেনের হুতিরা গত বুধবার দাবি করেছে, তারা মারিবের আকাশে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি হুতিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। হুতিরা এ ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে শহরটিতে তাদের যোদ্ধাদের এমন একটি জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সৌদি চিহ্নযুক্ত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের বলে মনে হয়েছে।
হুতিদের দাবি, ‘স্থানীয়ভাবে তৈরি’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ওই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। সত্যি হলে, ওই এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে হুতিদের সক্ষমতায় এটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবে। এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী তুলনামূলকভাবে আকাশপথে আধিপত্য ধরে রেখেছে। প্রতিবেশী দেশটিতে বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতার ওপরও তারা ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে।
এদিকে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় বৃহস্পতিবার অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশুও রয়েছে। হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতে ওয়াশিংটনকে আরও সরাসরি ভূমিকা নেয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে রিয়াদ। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতি, সৌদি আরব এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার এই সংঘাতে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না।
অন্যদিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে সম্ভাব্য চীনা গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ সপ্তাহে জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বেইজিং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি পেয়ে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এ কারণে এফ-৩৫ বিক্রির বিরোধিতা করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি। তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটিতে রয়েছেন।
এক বিবৃতিতে কৃষ্ণমূর্তি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন সতর্ক করছে যে এই চুক্তির ফলে আমেরিকার সামরিক প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নাগালের মধ্যে চলে যেতে পারে, তখন এই চুক্তি এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়।’
এর আগে গত মাসে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ওয়াশিংটনের ওপর কম নির্ভর করে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ খুঁজছে দেশগুলো।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে সৌদি আরবের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে দেশটি সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে। লকহিড মার্টিনের তৈরি অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চালিয়ে আসছে।
স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে এফ-৩৫ শত্রুপক্ষের রাডার ও অন্যান্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এড়িয়ে অভিযান চালাতে সক্ষম। এ কারণেই এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে এখন পর্যন্ত শুধু ইসরায়েলের কাছেই এফ-৩৫ রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে দেশটি এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে এবং ইতোমধ্যে একাধিক স্কোয়াড্রন গড়ে তুলেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য ৪০ হাজার ভারী বোমাসহ ২৮০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করতে যাচ্ছে। এতে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের এমকে৮৪ বোমাসহ উচ্চমাত্রায় বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম ৪০ হাজার বোমা রয়েছে।
এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
এপি জানিয়েছে, এখনো চূড়ান্ত না হওয়া এই অস্ত্র প্যাকেজে ৪০ হাজার বোমা রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ২০ হাজার এমকে৮৪ বোমা রয়েছে। এগুলো উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক বোমা।
এছাড়া রয়েছে আরও ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ বোমা, যেগুলোও উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক এবং মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে। এসব বোমা এমনভাবে তৈরি, যাতে আকাশ থেকে ফেলা হলে বাতাসের বাধা কম পায় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই অস্ত্র চুক্তির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। চুক্তির বেশিরভাগ অর্থ বিদেশি সামরিক সহায়তার মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
এ ব্যবস্থায় মার্কিন করদাতাদের অর্থ ইসরায়েলকে দেয়া হয় এবং পরে ইসরায়েল সেই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই অস্ত্র কেনে।
মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘সব বিদেশি অস্ত্র বিক্রয়ই যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে’। তবে বর্তমানে আলোচনায় থাকা চুক্তিগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
পড়ুন : ব্যাংক খাতে নতুন নিয়মে যা থাকছে, মালিকানাতেও কী আসছে স্বচ্ছতা?
সা/


