বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে মহানগর, আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার রুটে বাস-মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সহকারী সচিব জসিম উদ্দিনের সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসে যাত্রীপ্রতি প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন জেলা—নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। বাসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রে ৮ টাকা করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অনুমোদিত আসন সংখ্যা কমিয়ে কোনো বাস বা মিনিবাসের আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে নির্ধারিত ভাড়া আনুপাতিক হারে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে রুট পারমিট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ অথবা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কাছ থেকে আনুপাতিক হারে ভাড়ার হার অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে।

তবে নতুন নির্ধারিত ভাড়া গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। একই সঙ্গে প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নির্ধারিত ভাড়ার হার বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে হবে।

জনস্বার্থে জারি করা নতুন ভাড়ার হার মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) থেকেই কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাড়তি বাসভাড়ায় চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ

বাসভাড়া বৃদ্ধি বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণপরিবহনের ভাড়া বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বাড়তি ভাড়ার কারণে যাত্রীদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি

হঠাৎ যাতায়াতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও দিনমজুরদের মাসিক বাজেটে চাপ তৈরি হয়। বাড়তি পরিবহন ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাদের অন্যান্য খাতের খরচেও প্রভাব পড়ে।

অন্যদিকে বাসের ভাড়া বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শাকসবজি, চাল-ডালসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও নৈরাজ্য

সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও অনেক সময় বাস মালিক ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ‘ওয়েবিল’ বা ‘সিটিং সার্ভিস’-এর নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতাও দেখা যায়।

স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুই বা তিন কিলোমিটার পথের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হয়।

ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডা

ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কন্ডাক্টর বা বাসের হেলপারের কথা কাটাকাটি ও তর্কাতর্কির ঘটনা নিয়মিতই দেখা যায়। কখনও কখনও তা হাতাহাতিতেও গড়ায়।

অতিরিক্ত ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া বা অপদস্থ করার মতো ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে নারী ও প্রবীণ যাত্রীরা এসব ঘটনায় বেশি হেনস্থার শিকার হন।

বিকল্প পরিবহনের সংকট

সাধারণ মানুষের জন্য সর্বত্র সাশ্রয়ী বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বাড়তি ভাড়া দিয়েই বাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। ট্রেন বা মেট্রোরেল সব জায়গায় না থাকায় বাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও সীমিত।

খরচ কমাতে স্বল্প আয়ের অনেক মানুষ দীর্ঘ পথ হেঁটেও যাতায়াত করেন। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ে।

নজরদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য বন্ধে প্রতিটি বাসে বাধ্যতামূলকভাবে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। এ ব্যবস্থায় যাত্রীরা দূরত্ব অনুযায়ী ডিজিটাল মেশিনের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ করবেন। এতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ কমবে।

এ ছাড়া বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করলে বাসের লাইসেন্স বাতিল এবং বড় অঙ্কের জরিমানার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর জন্য ২৪ ঘণ্টার কার্যকর হটলাইন ও মোবাইল অ্যাপ চালুর কথাও বলা হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা বিআরটিএর নির্দিষ্ট নম্বরে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পরিবহন খাতে সংস্কারের প্রস্তাব

ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে শত শত মালিকের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি বা কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থায় বাসের রেষারেষি কমানোর পাশাপাশি ভাড়ায় শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাসের ভাড়া না বাড়িয়ে সরকার পরিবহন খাতে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টিও প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমানো সম্ভব হবে।

বাসচালক ও হেলপারদের দৈনিক চুক্তির পরিবর্তে মাসিক নির্দিষ্ট বেতনের আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে। চুক্তিভিত্তিকভাবে বাস পরিচালনার কারণে বেশি আয় করতে চালক ও শ্রমিকরা অতিরিক্ত যাত্রী তোলা এবং বেশি ভাড়া নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিকল্প গণপরিবহন বাড়ানোর প্রস্তাব

বাসের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমাতে মেট্রোরেল ও বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT) নেটওয়ার্ক আরও সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। দ্রুত ও গণমুখী এসব পরিবহন ব্যবস্থা বাড়লে সাধারণ মানুষের জন্য বিকল্প যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।

পাশাপাশি সরকারি বাসের সংখ্যা ও রুটের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বাণিজ্যিক লাভের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (BRTC) বাস বাড়ানো হলে বেসরকারি বাসের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পড়ুন : বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন