বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শিশু জুলিয়া হত্যা : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে খালাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

২০০৫ সালে চট্টগ্রামে শিশু জুলিয়া আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেনকে খালাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। মামলার মূল আসামিকে গ্রেপ্তার না করে আমির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালত।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আলোচিত এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর আমির হোসেনকে খালাস দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। ওইদিন মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করা হয়। তার আগে ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শিশু জুলিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আমির হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালের ১৬ মে হাটহাজারী উপজেলার মেখল গ্রামে ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে যায় শিশু জুলিয়া আক্তার। ওই বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন আমির হোসেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওইদিন শিশু জুলিয়াকে অপহরণ করে বাড়ির পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ খালে ফেলে দেওয়া হয়। খালপাড় থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় জুলিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে আমির হোসেনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

পরে পুলিশি তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। এর পরের বছর ২০০৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়। মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষ্য দেন।

ভুল তদন্তে মৃত্যুদণ্ড, ২১ বছর পর খালাস 

শিশু জুলিয়া আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ভুলভাবে গ্রেপ্তার, মিথ্যা অভিযোগ এবং একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনের ২১ বছর কেড়ে নেওয়ার দায় দায়িত্বহীন পুলিশ প্রশাসন, ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার ওপর বর্তায়।

ত্রুটিপূর্ণ পুলিশ তদন্ত

২০০৫ সালের ১৬ মে শিশু জুলিয়া আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার পর খালের পাড় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পরিবার মামলা করলেও তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত না করে আমীর হোসেনকে জড়িয়ে ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট দেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। কিন্তু এ মামলায় মূল আসামিকে না ধরে আমীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা সঠিকভাবে যাচাই না করেই আমীর হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।

নিম্ন আদালতের রায়ে প্রশ্ন

২০১৯ সালে নিম্ন আদালত আমীর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মামলায় ১৯ জন সাক্ষ্য দিলেও তাদের সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফৌজদারি আইনের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অপরাধ যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ মামলায় পুলিশের দেওয়া তথ্য ও দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের রায় দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি না থাকলে এবং তদন্ত সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে একজন মানুষকে ২১ বছর কারাগারে এবং কনডেমড সেলে থাকতে হতো না—এমন বক্তব্যও উঠে এসেছে।

কনডেমড সেলের ২১ বছর

একজন নিরপরাধ মানুষকে দীর্ঘ ২১ বছর কারাগারে আটক রাখা এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের অপেক্ষায় কনডেমড সেলে রাখা তার মৌলিক ও মানবাধিকারের প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না।

রাষ্ট্রের দায় ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন

ভুল বিচার বা দীর্ঘ কারাবাসের জন্য বাংলাদেশে সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ আর্থিক ক্ষতিপূরণের আইন না থাকলেও, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট পিটিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করার নজির রয়েছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার পেশাদারিত্বের অভাব এবং জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির কারণে এমন ভুল বিচার হলে তা দেশের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য প্রশ্ন তৈরি করে।

তদন্ত কর্মকর্তার জবাবদিহিতা

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের মাধ্যমে একজন নির্দোষ ব্যক্তির জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রবিধান (PRB) এবং দণ্ডবিধির ২১১ ধারা—মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের এবং ১৬৬ ধারা—আইন অমান্য করে ক্ষয়ক্ষতি করার বিধান অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা বলা হয়েছে।

পড়ুন : ১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলেও নারী-শিশু মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন