ডিজেলের দাম বাড়ার ধাক্কা এবার সরাসরি পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে রাজধানীতে কয়েক ধরনের সবজির কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা এবং কাঁচামরিচের কেজিতে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। একই সময়ে ডিমের ডজনেও বেড়েছে ৫ টাকা।
বাজারে এই বাড়তি দামের পেছনে পরিবহন ব্যয় কতটা প্রভাব ফেলছে, তার চিত্র মিলেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। মঙ্গলবার বিকেল প্রায় ৪টায় পাকা আড়তখ্যাত মার্কেটের পশ্চিম পাশের সড়কে দেখা যায়, দেড় টন পণ্য বহনকারী একটি ছোট ট্রাক থেকে শ্রমিকরা বস্তাভর্তি গাজর নামিয়ে হাসিনা মার্কেটের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। পরে সেগুলো একটি খালি আড়তে রাখা হয়।
আলমগীরের হিসাবে, তাঁর ট্রাক এক লিটার ডিজেলে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ যায়। ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে পণ্য পরিবহনে দুদিন আগের তুলনায় এখন ১৬০ টাকার বেশি অতিরিক্ত ডিজেল লাগছে। বাড়তি এই খরচের কারণেই ট্রাকের ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
যে গাজরগুলো ট্রাকে করে আনা হয়েছে, সেগুলোর মালিক আড়তদার আবদুল হান্নান। তিনি বলেন, ডিজেলের দামের সঙ্গে সবকিছুরই সম্পর্ক রয়েছে। ২০০ টাকা বেশি ভাড়া দেওয়ার এই বাড়তি খরচও শেষ পর্যন্ত গাজর বিক্রি করেই তুলতে হবে।
সোমবার গাজরের দর যেখানে কেজিতে ৫০ টাকা ছিল, মঙ্গলবার তা কত হয়েছে—জানতে চাইলে আবদুল হান্নান বলেন, ‘ধরেন, সোমবার দর ছিল ৫০ টাকা; আজ হবে ৫৫ টাকা। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে কত বাড়বে, তা বলা যাচ্ছে না।’
এদিকে টানা কয়েক মাস ধরেই নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে রয়েছেন ভোক্তারা। এর মধ্যে নতুন করে ডিজেলের লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শুরুতেই বাড়তি চাপ দেখা দিয়েছে সবজি ও ডিমের বাজারে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে সবজির কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা এবং ডিমের ডজনে ৫ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন সবজি, মাছসহ নানা ধরনের পণ্য ঢাকায় আসে। এসব পণ্য পরিবহনে ট্রাকের ভাড়া বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারদরে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর ইতোমধ্যে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। সেই বাড়তি পরিবহন ব্যয় এখন পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, শাকসবজির পাশাপাশি সামনে বাজারে আসা অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর ওই সপ্তাহে রাজধানীর বাজারে সবজির দাম কিছুটা বেড়েছিল। পরে অবশ্য কিছুটা কমেও আসে। গত রোববার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পটোল ও ঢ্যাঁড়শ ৪০ থেকে ৬০ টাকা, ঝিঙে, ধুন্দুল, লম্বা বেগুন ও উচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
তবে গতকাল রাজধানীর মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার, তেজগাঁও কলোনি বাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এসব পণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি এসেছে। পটোল ও ঢ্যাঁড়শ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। ঝিঙে, ধুন্দুল, লম্বা বেগুন ও উচ্ছের দামও উঠেছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। অর্থাৎ এসব সবজির কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে দাম। অন্যদিকে কাঁচামরিচের কেজি ৩০ টাকা বেড়ে এখন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি পর্যায়ে বাড়তি দামের প্রভাব খুচরা বাজারে কীভাবে পড়ে, তার একটি হিসাবও দিয়েছেন মহাখালী কাঁচাবাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যাপারীরা কৃষকের কাছ থেকে সবজি কিনে ট্রাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর সেগুলো বিক্রি করেন পাইকারদের কাছে। পাইকারদের কাছ থেকে পণ্য কিনে খুচরা ব্যবসায়ীরা তা ভোক্তার কাছে বিক্রি করেন। অর্থাৎ কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগে আরও তিন ধাপে পণ্যটি কেনাবেচা হয়।
মিজানুর রহমানের ভাষ্য, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ব্যাপারী যদি এক টাকা বাড়তি খরচ করেন, তাহলে সেই বাড়তি খরচ পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে আরও বাড়ে। তাঁর হিসাবে, তিন ধাপে এক টাকা করে বাড়লে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর তিন টাকা বাড়তি চাপ পড়ে। এভাবেই পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি অংশ পণ্যের খুচরা দামে যুক্ত হয়।
কলমিলতা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেনও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করি ডিজেলের দাম বাড়াইল সরকার। অহন এমন কোনো কিছুই বাদ থাকবে না, সব জিনিসের দর বাড়বে। আইজ না হোক, কাল হলেও বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘গাড়ির মালিকরা ট্রাক ভাড়া বাড়াইছে। ব্যাপারীরা যহন ট্রাক ভাড়া বেশি দিব, তখন হ্যারা (তারা) সবজিও বেশি দামে বেচব। তার মানি খুচরা কাস্টমারের কাছে বেশি দামে বেইচতে হইব।’
তবে ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়লেও সেই সুযোগে বাজারে কেউ যেন অরাজকতা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য সরকারের কঠোর নজরদারির প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা সব সময় দাম বাড়ানোর ইস্যু খোঁজেন। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে চ্যাপ্টা হচ্ছে ভোক্তা। এখন ডিজেলের দর বৃদ্ধি জিনিসপত্রের দামকে আরও উস্কে দেবে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে উঠছে। কম আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, বাজারে এখন আগের মতো নজরদারি নেই। কঠোর তদারকি ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, সারাদেশে তাদের কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের পক্ষে সব দিক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সূত্র: সমকাল
পড়ুন: ব্রাজিল কেন জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ দেয়, জানেন কি?
আর/


