বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগকে মদদ দিচ্ছে কে, ঝটিকা মিছিলের নেপথ্যে কারা?

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী একে অপরকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ করছে।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ঝটিকা মিছিল ও সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসার পরই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, জামায়াতের ‘গোপন সমঝোতা’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের’ কারণে আওয়ামী লীগের এসব তৎপরতা উৎসাহিত হচ্ছে। বিপরীতে জামায়াতের দাবি, সরকারের কোনো একটি অংশের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া নিষিদ্ধ দলের পক্ষে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে এমন কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব নয়।

এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও। তাদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরকে দায়ী করার পাশাপাশি নিষিদ্ধ দলের সহিংস ও নৈরাজ্যকর কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এদিকে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিও বেড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একাধিক ঝটিকা মিছিল করেছে।

এর মধ্যে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান এলাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। ১৫০ থেকে ২০০ জন গুলশান রোড নম্বর-৩-এর পুলিশ প্লাজার কাছে কেএফসির পাশের একটি গলিতে জড়ো হন। সেখানে তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন এবং কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। মসজিদে জুমার নামাজ চলার সময় ঘটনাটি ঘটে।

পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাবার বুলেট ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরিত না হওয়া কয়েকটি ককটেলও উদ্ধার করা হয়। মিছিলের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে এ পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এর কয়েক দিন পর গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর গুলিস্তানেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করেন। জাতীয় স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেটের সামনে কয়েকজন সমর্থক জড়ো হয়ে মিছিলের উদ্যোগ নিলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অংশগ্রহণকারীরা কয়েক সেকেন্ড মিছিল করার পরই তা পণ্ড হয়ে যায়।

ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ

১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, মালিবাগ ও মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা ও মিরপুর এলাকাতেও বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনার জন্য নিষিদ্ধ সংগঠন ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর আকস্মিক আন্ডারগ্রাউন্ড তৎপরতাকে দায়ী করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকাজুড়ে নিরাপত্তা সতর্কতাও জোরদার করা হয়েছে।

গুলশানের ঝটিকা মিছিলের পর আওয়ামী লীগকে মদদ দেওয়ার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেন ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতি ‘জামায়াতের পুরোনো ভালোবাসা’ আবার জেগে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে।

নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া বক্তব্যে রাশেদ খান আরও বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার জন্য বিএনপি ও জামায়াতকে একসঙ্গে কাজ করার কথা ছিল, যাতে তারা আগে ফ্যাসিবাদবিরোধী ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু জামায়াত এখন দেশে-বিদেশে আওয়ামী লীগের অপকর্মের বিষয়ে নীরব হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরের সময় সেখানে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা নিয়েও তারা নীরব।

এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর রাশেদ খান রাস্তায় আওয়ামী লীগের মিছিল করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আওয়ামী লীগকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ করেন।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী বলেন, জামায়াতের সঙ্গে ‘গোপন সমঝোতার’ কারণে আওয়ামী লীগ রাস্তায় নামার সাহস পেয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতের কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে উৎসাহিত করছে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিরোধী দলটি মনে করছে, তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে লাভবান হতে পারবে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আবার মাথাচাড়া দিলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তবে বিএনপির কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও এ ধরনের অন্যান্য কর্মকাণ্ড একেবারেই গুরুত্বহীন। জনগণও এটিকে গণ্য করার মতো বিষয় হিসেবে দেখছে না।’

তিনি বলেন, ‘দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ। সেখানে ১০০ থেকে ২০০ জনের হঠাৎ করে জড়ো হয়ে একটু শ্লোগান তুলে পালিয়ে যাওয়া কোনো বিষয়ই নয়।’

অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে রাস্তায় নামার সুযোগ দেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারকেই দায়ী করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ১২ সেপ্টেম্বর বলেন, আওয়ামী লীগের আকস্মিক ফ্ল্যাশ মিছিলের পেছনে বিএনপি সরকারের সায় রয়েছে বলেই সবাই মনে করে।

রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সরকারের সমর্থন ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংগঠিত করা অসম্ভব। তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা আছে। তাহলে একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট দল কীভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের মিছিল সংগঠিত করতে পারে?’

তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে সরকারের কোনো একটি অংশ আওয়ামী লীগকে রাস্তায় নামার সবুজ সংকেত দিয়েছে।’

জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন দলটির মুখপাত্র ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের বিরুদ্ধে পতিত ফ্যাসিস্টকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তোলা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির মতো অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জামায়াতও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজপথে ছিল। তাহলে এখন তারা কীভাবে এমন মিথ্যা অভিযোগ তোলে? আমরা ১১ দলীয় জোট এখন গণমানুষের দাবি বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার দাবিতে রাজপথে আছি।’

জামায়াতের মুখপাত্র আরও অভিযোগ করেন, বিরোধী দলগুলোর দাবির মূল বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দিতেই ক্ষমতাসীন দল এমন কৌশল নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করছি। আর দেশবাসী দেখছে, আমাদের আন্দোলন শতভাগ শান্তিপূর্ণ। তাই ক্ষমতাসীন দলের ভিত্তিহীন অভিযোগ জনগণ গ্রহণ করবে না।’

এদিকে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে আরেক বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ওই বিক্ষোভ মিছিলে এনসিপির নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট মিছিল করে, তারেক রহমান কী করে?’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলছেন

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যখন পরস্পরকে দায়ী করার পালা চলছে, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, নিষিদ্ধ দলটির ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্টরা এখন গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দোষারোপের বিষয়টি পাশে রেখে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পতিত আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর শক্ত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে এবং তাদের কর্মকাণ্ড জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করছি, দেশব্যাপী হত্যাকাণ্ড ও এ ধরনের অন্যান্য জঘন্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকতে পারে এবং এর পেছনে পতিত শক্তিটি থাকতে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজা বলেন, ‘দেশে বিরোধী ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে দোষারোপের রাজনীতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এর মাধ্যমে কখনোই সমাধান বের হবে না।’

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা দেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।’

সোমালিয়ার দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান বলেন, ‘বাংলাদেশে সংবিধানের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে।’

ড. আসিফ মিজান বলেন, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল যখন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যকার ফাঁক দিয়ে ফ্যাসিস্টরা প্রবেশের সুযোগ পায়।

গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি সব রাজনৈতিক দলকে আরও দায়িত্বশীল হওয়া এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান।

সূত্র: এশিয়া পোষ্ট

পড়ুন: সব নিত্যপণ্যের বাজার চড়া, পুড়ছে ভোক্তার পকেট

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন