ডেঙ্গুর বিস্তার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বছরের নির্দিষ্ট একটি মৌসুমের রোগ হিসেবে এটিকে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এডিস মশার বিস্তারের পরিধিও বাড়ছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১০৪ জন। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হওয়ায় চলতি বছরে এই রোগে মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬৮ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন।
এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই মারা গেছেন ১০৪ জন। ফলে চলতি বছরের প্রথম আট মাসের মোট মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে এক মাসের সেপ্টেম্বর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুর প্রকোপে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেওয়া বার্তায় সংস্থাটি এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ডব্লিউএইচওর উল্লেখ করা লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, হাড়ের জোড়া ও পেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে লালচে ছোট ছোট ফুসকুড়ি। এসব লক্ষণের যেকোনোটি দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাত বছরে বদলে গেছে ডেঙ্গুর চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে গত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ২৯৬ জনের। বিপরীতে পরবর্তী ৭ বছর ৯ মাসেই মশাবাহিত এই রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৪৬৬ জন।
আক্রান্তের হিসাবেও একই ধরনের বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সরকারি সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ২০৮। পরবর্তী ৭ বছর ৯ মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯১ জনে।
অর্থাৎ, সবশেষ ৭ বছর ৯ মাসে আগের দেড় যুগের তুলনায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ১১ দশমিক ৭১ গুণ। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৬ গুণ।
কেন বাড়ছে ভয়াবহতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা কম নথিভুক্ত হওয়া, হাসপাতালে যেতে দেরি করা এবং একই ব্যক্তির একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়াকে তারা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন।
তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে এডিস মশা বেশ ভালোভাবেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ফলে ডেঙ্গুকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের রোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। এমনকি ফেলে দেওয়া ছোট কোনো পাত্রের ভেতরেও এই মশার প্রজনন হতে পারে। ফলে মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও বিস্তার
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে, ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর শুধু শহরাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্রমেই গ্রামাঞ্চলেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।
এর সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বারবার সংক্রমণের বিষয়টিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। একজন ব্যক্তি একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। আগে যেসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ছিল কম কিংবা প্রায় ছিল না বললেই চলে, তারাও এখন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
ফলে শুধু আক্রান্তের সংখ্যা কমানো নয়, ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ এবং রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বল্পমেয়াদি অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ডেঙ্গুর মতো বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদি অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও জনকেন্দ্রিক জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর পরিবর্তিত বিস্তার ও সংক্রমণের ধরন বিবেচনায় নিয়ে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দিতে হবে।
পড়ুন: এ বছর হচ্ছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন
আর/


