বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চলনবিলের জলে পদ্মের হাসি দেখতে প্রতিদিন ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিলের বুকজুড়ে ফুটে থাকা পদ্ম দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ধরে রাখছেন মুহূর্তটি, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরছেন বিলের পাড়ে। একসময় যে পদ্ম হারিয়ে গিয়েছিল এ অঞ্চল থেকে, সেই পদ্মই যেন দীর্ঘ নীরবতার পর আবার ফিরে এসে জানান দিচ্ছে প্রকৃতি সুযোগ পেলে তার হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে জানে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শাকুয়াদীঘি এলাকার বাঘমারা বিলে গিয়ে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায়, জলের ওপর ছড়িয়ে আছে পদ্মপাতা। তার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে শত শত ফুল।

ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। বিলের শান্ত জলে হালকা বাতাসের ঢেউ। সেই ঢেউয়ের বুক চিরে মাথা তুলে আছে অসংখ্য পদ্ম। কোনোটি সবে কলি মেলেছে, কোনোটি পূর্ণ প্রস্ফুটিত, আবার কোনোটি রোদ ছুঁয়ে যেন মৃদু হাসছে। দূর থেকে তাকালে মনে হয় জল নয়, এ যেন বিশাল কোনো সবুজ ক্যানভাস। তার ওপর প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকে দিয়েছে সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের শত শত ফুল।

ভাদ্রের শুরুতেই কলি থেকে ফুল হয়ে ফুটতে শুরু করেছে পদ্ম। স্থানীয়দের মতে, আবহাওয়া ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে শীতের আগমন পর্যন্ত চলবে এই ফুলের উৎসব।

তাড়াশের নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক সনাতন কুমার দাস বলেন, দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সাল থেকে বাঘমারা বিলে নিয়মিত পদ্ম ফুটতে শুরু করেছে। প্রায় চার দশক এই এলাকায় পদ্মের দেখা মেলেনি। তারপর হঠাৎ করেই যেন পুরোনো কোনো স্মৃতি ফিরে এসেছে।

সনাতন কুমার দাশের ভাষায়, পদ্মের এই ফিরে আসা শুধু তাড়াশের মানুষকে নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষকেও আকৃষ্ট করেছে। ফুলের সৌন্দর্য দেখতে এখন অনেকেই ছুটে আসছেন বাঘমারা বিলে।

জীববিজ্ঞানের শিক্ষক উম্মে নাফসুনের মতে, পদ্ম একটি বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এটি আবার বংশবিস্তার করে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ বাঘমারা বিলে পদ্মের ফিরে আসা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই হয়তো তৈরি হয়েছে তার নতুন আবাস।

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, পাখির মাধ্যমে পদ্মের বীজ এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অনুকূল পরিবেশ পেলে সেই বীজ থেকেই গাছ জন্মায় এবং ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় পুরো বিলজুড়ে। প্রকৃতি যেন নিজের অদৃশ্য হাতে বয়ে নিয়ে এসেছে পদ্মের বীজ। আর সেই বীজ থেকেই আজ বাঘমারা বিলের জলে ফুটছে শত শত ফুল।

চলনবিল শুধু একটি বিল নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘ ইতিহাসের নাম। অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। ১৯০৯ সালের এক জরিপে এর আয়তন কমে দাঁড়ায় ১৪২ বর্গমাইলে। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের জলমগ্ন এলাকা থাকে প্রায় ৮৫ বর্গকিলোমিটার। চলনবিল এলাকার বিভিন্ন নামে রয়েছে ৩৯টি বিল। এসব বিলের মোট আয়তন প্রায় ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর। একসময় এসব বিলে পাওয়া যেত পদ্ম, শাপলা, মাখনা, সিঙ্গট, গেচু, চেচুয়া, ভাতসোলাসহ অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ। ছিল বিভিন্ন প্রজাতির ফার্ন, মস ও শৈবালও। সময় বদলেছে। বদলেছে বিলের প্রকৃতি। হারিয়ে গেছে অনেক উদ্ভিদ। কিছু এখন বিপন্ন। সেই বাস্তবতায় বাঘমারা বিলে পদ্মের ফিরে আসা তাই শুধু একটি ফুল ফোটার ঘটনা নয়, এটি যেন হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির বুক থেকে উঠে আসা আশার একটি ছোট্ট আলো।

পদ্মের সৌন্দর্যের টানে বিলে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। তবে সৌন্দর্য দেখতে এসে কেউ কেউ নিজের অজান্তেই সেই সৌন্দর্য নষ্ট করছেন। অনেকে ইচ্ছেমতো পদ্মফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে একজনের হাতে আনন্দের স্মৃতি হলেও অন্য দর্শনার্থীর জন্য কমে যাচ্ছে ফুল দেখার সুযোগ।

পদ্মবিলে বেড়াতে আসা মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার লেখক উজ্জ্বল কুমার মাহাতো বলেন, অনেক দিন ধরেই তিনি বাঘমারা বিলের পদ্মের কথা শুনে আসছিলেন। অবশেষে এসে নিজের চোখে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তবে মানুষের নির্বিচারে ফুল তোলার দৃশ্য তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য সবার জন্য। তাই ফুল না তুলে দূর থেকে তার সৌন্দর্য উপভোগ করাই উচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা জানান, তাঁরা নিজেদের মতো করে পদ্মফুল রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দর্শনার্থীদের নির্বিচারে ফুল তোলা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

শাহজাদপুর থেকে পরিবার নিয়ে বাঘমারা বিলে পদ্মফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছেন শহিদুল ইসলাম। বিলজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য পদ্মফুল ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ তিনি।

শহিদুল ইসলাম বলেন, বাঘমারা বিলের সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর বিলের পানিতে ফুটে থাকা সারি সারি পদ্মফুল যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব ছবি। পরিবার নিয়ে এখানে এসে আমরা সবাই আনন্দিত। বিশেষ করে সন্তানরা পদ্মফুলের সৌন্দর্য দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত। তিনি আরও বলেন, ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে একটু স্বস্তি পেতে প্রকৃতির এমন নির্মল পরিবেশে আসার কোনো বিকল্প নেই। বাঘমারা বিলের এই অপরূপ সৌন্দর্য শুধু আমাদের মুগ্ধই করেনি, বরং গ্রামবাংলার চিরচেনা প্রকৃতির প্রতি নতুন করে ভালোবাসা তৈরি করেছে। সুযোগ পেলে আবারও পরিবার নিয়ে এখানে আসতে চাই।

এ ব্যাপারে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, পদ্মবিলের কথা শুনেছি। ফুল রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ ফুল দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। কেউ ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন। কেউ আবার হয়তো না বুঝেই ছিঁড়ে নিচ্ছেন সেই ফুল, যে ফুলটি হয়তো আরও কয়েকজন মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কথা ছিল।

প্রকৃতি বড় নীরব। সে প্রতিবাদ করে না, শুধু ঋতুর পর ঋতু নিজের মতো করে ফুল ফোটায়। চার দশক হারিয়ে থাকার পর বাঘমারা বিলে পদ্ম ফিরে এসেছে। এখন প্রশ্ন একটাই এই ফিরে আসা কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে মানুষের হাতেই।

আজ যে বিলের জলে শত শত পদ্ম দুলছে, সেখানে আগামী বছরও যেন একই দৃশ্য দেখা যায়। আগামী প্রজন্মের কেউ যেন এসে বিস্মিত চোখে বলতে পারে। এত পদ্ম! মনে হচ্ছে, পুরো বিলটাই যেন ফুল হয়ে ফুটেছে। সেই দৃশ্যটুকু বাঁচিয়ে রাখাই হয়তো বাঘমারা বিলের পদ্মের প্রতি মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ৯০ বোতল উইনসেরেক্স সিরাপসহ ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রেফতার ২

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন