যশোরের মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম লাউড়ী। সেই গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে আসা মো. আব্দুল আলীম এখন বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে ডেপুটি চিফ অব ক্যাবিনেট (উপপ্রধান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। চিফ অব ক্যাবিনেটের পরই এটি কার্যালয়ের দ্বিতীয় শীর্ষ পদ।
১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর চার দশক পেরিয়ে দ্বিতীয়বার সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ পেয়েছে বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এই অধিবেশনে সভাপতির কার্যালয় পরিচালনার গুরু দায়িত্বের বড় অংশ এখন আলীমের কাঁধে।
কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৪০ সদস্যের এই কার্যালয়ে কাজ করছেন অন্তত ২৮টি দেশের কূটনীতিক ও জাতিসংঘ কর্মকর্তারা। তাদের ২০ জন বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের সরকার থেকে প্রেষণে এসেছেন। উপপ্রধান হিসেবে ড. আব্দুল আলীম কার্যালয়ের আটটি দলের কাজ তদারকি করেন। এর মধ্যে ছয়টি বিষয়ভিত্তিক দল কাজ করে রাজনৈতিক বিষয়, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দেশ, মানবাধিকার, জাতিসংঘ সংস্কার এবং ডিজিটাল উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। বাকি দুটি হলো নির্বাহী দপ্তর এবং ভাষণ লিখন ও গণমাধ্যম সংক্রান্ত।
কার্যালয়ে আলীমসহ বাংলাদেশি কর্মকর্তা আছেন ছয়জন। তার তত্ত্বাবধানে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান, যিনি নির্বাহী দপ্তরে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে কাজ করছেন।
জাতিসংঘ সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে সভাপতিকে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন আলীম। জাতিসংঘের ইতিহাসেও এই অধিবেশন বিশেষ, কারণ এবারই নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংস্থার দশম মহাসচিবকে নিয়োগ দেবে সাধারণ পরিষদ। বিশ্বজুড়ে নজর কাড়া এই প্রক্রিয়ায় সভাপতির ভূমিকা পালনে সহায়তা ও সমন্বয়ের কাজও করছেন তিনি। নিরাপত্তা পরিষদে আটজন প্রার্থীকে নিয়ে এরই মধ্যে তিন দফা অনানুষ্ঠানিক ভোট হয়েছে।
লাউড়ী গ্রামের প্রয়াত হোমিও চিকিৎসক আব্দুল করিম ও আমেনা বেগমের ছয় ছেলের মধ্যে ড. আলীম পঞ্চম। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ এই পরিবারের পরিচয়। বড় ভাই প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়েছেন, মেজ ভাই ছিলেন ব্যাংকার। সেজ ভাই লালমনিরহাটের এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোনটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন ছিলেন। আরেক ভাই লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, ছোট ভাই শিক্ষকতা করেন ঢাকায়।
শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন আলীম। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় বৃহত্তর যশোরে প্রথম হন তিনি। পরীক্ষায় বোর্ড পর্যায়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফল করে স্থান করে নেন জাতীয় মেধা তালিকায়। ছোটবেলার অর্থনীতিবিদ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুটিতেই পান প্রথম শ্রেণি।
এরপর দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি, ১৮তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারের প্রথম হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব হিসেবে। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১০ সালে জাতিসংঘে যোগ দেন ড. আলীম। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ, ক্ষুদ্র দ্বীপ, উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এবং জলবায়ু ও উন্নয়ন অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। স্বল্পোন্নত দেশ বিষয়ক উপকর্মসূচির প্রধান হিসেবে বাংলাদেশসহ বহু দেশের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ পথচলায় বিশ্বের নানা প্রান্তের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছে বিস্তৃত পেশাগত সম্পর্ক।
এত বড় দায়িত্বেও ড. আব্দুল আলীমের আচরণে অহংকারের ছাপ নেই, এমনটাই বলেন তাকে কাছ থেকে চেনেন যারা। শান্ত স্বভাব, ধৈর্য ও সততার জন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি প্রশংসিত। অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বিষয় কিংবা বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ, যে কোনো বিষয় সহজ করে বুঝিয়ে দিতে ভালোবাসেন তিনি। বাংলা, ইংরেজি ও আরবির পাশাপাশি উর্দু, হিন্দি ও ফরাসি ভাষাতেও সমান পারদর্শী।
স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন ড. আব্দুল আলীম। স্ত্রী নিউ ইয়র্কের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বড় ছেলে সামিদ আলীম বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিনে এবং ছোট ছেলে আরাদ আলীম নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। মেয়ে স্কুল ছাত্রী। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সন্তানেরাও মেধা বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
পড়ুন : সংস্কারের প্রয়োজন আছে, তবে জাতিসংঘের বিকল্প নেই: খলিলুর রহমান


