বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকিতে মানুষ, বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

মেহেরপুরের গাংনীতে অসুস্থ গবাদিপশু জবাই, মাংস কাটা ও নাড়াচাড়ার মাধ্যমে বাড়ছে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ। গত এক যুগে এ উপজেলায় হাজারো মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরও মাত্র ৯ মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৪১৮ জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গবাদিপশুকে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়ায় বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। তবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, লোকবল ও টিকার সংকটের কারণে শতভাগ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন ১৯৯ জন। ২০১৪ সালে ২০৩ জন, ২০১৫ সালে ১৫৪ জন, ২০১৬ সালে ২৪০ জন, ২০১৭ সালে ২৮১ জন, ২০১৮ সালে ৪০৮ জন, ২০১৯ সালে ৬৬০ জন, ২০২০ সালে ৩৭৮ জন, ২০২১ সালে ৪১৭ জন, ২০২২ সালে ৬৪৪ জন, ২০২৩ সালে ৭৯৩ জন, ২০২৪ সালে ৬৮৬ জন এবং ২০২৫ সালে ৬৩৭ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন।

চলতি বছরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। মাত্র ৯ মাসেই গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪১৮ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী। আক্রান্তদের বেশিরভাগই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। আক্রান্তদের অনেকের শরীরে অসুস্থ গবাদিপশুর মাংস স্পর্শ বা নাড়াচাড়া করার পর হাতে জ্বালাপোড়া, ফোস্কা ও ক্ষত দেখা দিয়েছে। অসুস্থ গবাদিপশু জবাইয়ের পর মাংস নাড়াচাড়া করতে গিয়ে কবজিতে জ্বালাপোড়া ও ফোস্কা দেখা দেয় এক রোগীর। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়।

চর গোয়াল গ্রামের সেলিনা খাতুন বলেন, “ছাগলের মাংস কিনে বাড়িতে আনার পর হঠাৎ আমার হাতে ঘামাচির মতো একটি ফুসকুড়ি ওঠে। প্রথমে সেখানে চুলকানি ছিল, পরে ধীরে ধীরে ফুসকুড়িটি বড় হতে থাকে। এখন প্রচণ্ড জ্বালা ও যন্ত্রণা করছে। আমি একজন গরিব মানুষ, ঠিকমতো ওষুধ কিনে চিকিৎসা করানোও আমার জন্য অনেক কষ্টের।

বাওট গ্রামের আনিসুর রহমান বলেন, আমি ছাগলের ব্যবসা করি। একটি ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেটি জবাই করে বাজারে বিক্রি করি। পরে বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে এনে খাওয়ার পর আমার হাতে এমন একটি ফুসকুড়ি দেখা দেয়। প্রথমে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিইনি, কিন্তু পরে ধীরে ধীরে এটি বড় হতে থাকে এবং এখন হাতে জ্বালা ও যন্ত্রণা করছে।

একই গ্রামের পলি খাতুন জানান, গরুর মাংস পরিষ্কার করে রান্না করার পর আমার ডান হাতে ছোট্ট একটি ফোঁড়া তৈরি হয়। পরে সেটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং একই সঙ্গে হাতে জ্বালা ও যন্ত্রণা শুরু হয়। এরপর গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছি। বর্তমানে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ আছি।

মোমিনপুর গ্রামের রুহুল আমিন জানান, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে গবাদিপশুকে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত টিকা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে গবাদিপশুর মধ্যে রোগের বিস্তার ঘটছে। অসুস্থ বা মৃত গবাদিপশু জবাই করে মাংস বিক্রি এবং সেই মাংস কাটাকাটি ও নাড়াচাড়া করার সময় মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।

রায়পুর গ্রামের আব্দুল আলিম জানান , গবাদিপশুর টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে। অসুস্থ গরু যেন বাজারে বিক্রি বা জবাই করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সচেতন মহলের নাগরিক মজিবুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে অসুস্থ গরু বিক্রি হচ্ছে। এসব গরু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া জবাই করে মাংস বিক্রি করা হলে মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাজারে নিয়মিত তদারকি ও অসুস্থ গরু বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর একজন সচেতাল মহরের নাগরিক হেলাল উদ্দিন জানান, গবাদিপশুকে ঠিকমতো ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে পশুর মধ্যে রোগ বাড়ছে এবং সেই পশুর সংস্পর্শে এসে মানুষও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হচ্ছেন। নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি।

গাংনী পৌর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জানান, রাতের আঁধারে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করা হচ্ছে। এতে যারা মাংস কাটছেন বা নাড়াচাড়া করছেন, তারা ঝুঁকিতে পড়ছেন। প্রশাসনের উচিত বাজারে নজরদারি বাড়িয়ে এ ধরনের জবাই বন্ধ করা।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. মাসুদুর রহমান জানান,এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর গাংনী উপজেলায় শত শত মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্ত রোগীদের সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।চলতি বছর এ পর্যন্ত গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত ৪১৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সরকারিভাবে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। রোগীদের অসুস্থ গবাদিপশুর মাংস কাটা, নাড়াচাড়া বা সংস্পর্শে না আসার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।

গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফুল ইসলাম জানান, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে চলতি বছর ৩০ হাজার গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় লোকবল ও টিকার সংকট থাকায় শতভাগ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় টিকার সংখ্যা ও জনবল কম থাকায় শতভাগ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

গাংনীতে দীর্ঘদিন ধরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ দেখা দিলেও আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না। বরং কোনো কোনো বছর আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ গবাদিপশু জবাই, মাংস কাটা ও নাড়াচাড়ার সঙ্গে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার যোগসূত্র থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসুস্থ গবাদিপশু জবাই না করা, মৃত পশু নিরাপদভাবে অপসারণ, পশুর মাংস কাটার সময় সতর্কতা এবং নিয়মিত টিকাদান—এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি হাট-বাজারে নিয়মিত পশু পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানো গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; অ্যানথ্রাক্সের উৎস বন্ধে গবাদিপশুর টিকাদান, বাজার তদারকি এবং অসুস্থ পশু জবাই বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌর আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক আটক

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন